স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী নগরীর বিলশিমলা এলাকায় ১০ তলা ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগে তিন দফা নোটিশ দিয়েছে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ)। প্রথমে ৬০ দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হলেও অভিযোগ অনুযায়ী, নকশাবহির্ভূত নির্মাণ অপসারণ করা হয়নি। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ভবনমালিকদের আবারও ৩০ দিনের সময় দিয়েছে সংস্থাটি। এই সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত নির্মাণ অপসারণ করে নির্ধারিত জায়গা উন্মুক্ত না রাখলে ভবনের অনুমোদন বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে আরডিএ।
এদিকে, ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগকারী প্রতিবেশী মাহাবুব আলীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ভবনসংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। নিজের নিরাপত্তা চেয়ে গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজপাড়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী নগরীর রাজপাড়া থানাধীন বহরমপুর মৌজার নতুন বিলশিমলা এলাকার ২০৫ নম্বর দাগে বিভিন্ন পেশার ১৮ জন ব্যক্তি যৌথভাবে ১০ তলা ভবনটি নির্মাণ করছেন। ভবনটির চতুর্দিকে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত জায়গা না ছেড়ে অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণকাজ চলছে- এমন অভিযোগ তুলে প্রতিবেশী মো. মাহাবুব আলীসহ স্থানীয় বাসিন্দারা গত ১৫ জুলাই আরডিএতে লিখিত আবেদন করেন।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই দিনই আরডিএর চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইটসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নির্মাণাধীন ভবনটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরদিন ১৬ জুলাই আরডিএর তৎকালীন অথরাইজড অফিসার মো. আব্দুল্লাহ আল তারিক ভবন নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মো. মোশাররফ হোসেন, ডা. আনোয়ার হোসেনসহ অন্যদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন।
নোটিশে বলা হয়, নির্মাণস্থলে অনুমোদিত নকশা প্রদর্শন করা হয়নি। ইমারতের ভিত্তিসহ নির্মাণকাজ পরিদর্শন করিয়ে প্রমাণপত্র নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া অনুমোদন নম্বর, তারিখ ও অনুমোদিত তলার বিবরণসংবলিত তথ্যবোর্ডও স্থাপন করা হয়নি। এসব কারণে অনুমোদনের দ্বিতীয় শর্ত লঙ্ঘিত হয়েছে বলে উল্লেখ করে আরডিএ।
একই নোটিশে ভবনের সামনে, পেছনে ও উভয় পাশে অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত নির্মাণের অভিযোগ তুলে অনুমোদনের ১৬ নম্বর শর্ত ভঙ্গের বিষয়টি জানানো হয়। নির্মাণকাজ বন্ধ রেখে কেন অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলা বা অপসারণ করা হবে না, তার সন্তোষজনক জবাব সাত কর্মদিবসের মধ্যে দিতে বলা হয়। ভবনসংশ্লিষ্টরা জবাব দিলেও তা সন্তোষজনক হয়নি বলে জানায় আরডিএ।
এরপর গত ৯ আগস্ট দ্বিতীয় নোটিশ জারি করে সংস্থাটি। এতে বলা হয়, অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবনের সামনে, পেছনে ও উভয় পাশে বর্ধিত করে বেজমেন্টসহ একতলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে। আরডিএর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের অতিরিক্ত নির্মাণ ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ৩ ধারার লঙ্ঘন।
দ্বিতীয় নোটিশে ৬০ দিনের মধ্যে অনুমোদনবহির্ভূত নির্মাণ অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি জমির সীমানা থেকে ভবনের সামনে ৩ দশমিক ৩২ মিটার, পেছনে ৩ মিটার, পূর্ব পাশে ১ দশমিক ৫০ মিটার এবং পশ্চিম পাশে ১ দশমিক ২৫ মিটার জায়গা উন্মুক্ত রাখতে বলা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করলে ভবনের অনুমোদন বাতিল বলে গণ্য হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
এরপরও বিষয়টির নিষ্পত্তি না হওয়ায় গত ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার তৃতীয়বারের মতো নোটিশ জারি করে আরডিএ। সংস্থাটির অথরাইজড অফিসার ও ইমারত নির্মাণ কমিটির সদস্যসচিব মো. রাহেনুল ইসলাম রনির স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে ভবনমালিকদের ৩০ দিনের সময় দেওয়া হয়।
আগের নির্দেশনা অনুযায়ী, অনুমোদনবহির্ভূত নির্মাণ অপসারণ করে নির্ধারিত জায়গা উন্মুক্ত রাখতে বলা হয়েছে। অন্যথায় ভবনের অনুমোদন বাতিল বলে গণ্য হবে এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ৩(খ) ধারা অনুসারে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারী মো. মাহাবুব আলী বলেছেন, আরডিএর অনুমোদিত নকশা ও নির্দেশনা লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরেই তিনি অভিযোগ করেছিলেন। এরপর ভবনসংশ্লিষ্টরা তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, তাঁকে নিয়ে সম্মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হয়েছে এবং প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এ কারণে নিজের নিরাপত্তা চেয়ে গত শুক্রবার রাজপাড়া থানায় জিডি করেছেন তিনি।
মাহাবুব আলী বললেন, ‘আমি প্রথমে আরডিএতে অভিযোগ দিয়েছি। কারণ, তাঁরা অনুমোদিত নকশা ও আইন লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ করছেন। এ কারণে আমার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে এবং মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমি চাই, অনুমোদিত নকশা ও আইন মেনে ভবন নির্মাণ করা হোক। নিজের নিরাপত্তার জন্য থানায় জিডি করেছি।’
তবে নির্মাণাধীন ভবনের মালিকানা সংশ্লিষ্টদের একজন ডা. মো. আনোয়ার হোসেন বলেছেন, বিলশিমলায় প্রায় চার কাঠা জমিতে ১৮ জনের যৌথ মালিকানায় ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণের সময় পূর্ব পাশে প্রায় তিন ফুট জায়গা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হয়েছিল।
তিনি আরও বললেন, তবে এ নিয়ে বারবার অভিযোগ করায় আরডিএ থেকে একাধিক চিঠি এসেছে। সেসব চিঠির জবাবও দেওয়া হয়েছে। জমির সীমানা ও রাস্তার জায়গা নিয়েই মূল বিরোধ বলে দাবি করেন তিনি। এ নিয়ে সার্ভেয়ার দিয়ে জমি মাপাও হয়েছে।
এ বিষয়ে আরডিএর অথরাইজড অফিসার মো. রাহেনুল ইসলাম রনি বলেছেন, বিলশিমলা এলাকায় ১০ তলা ভবন নির্মাণের বিষয়টি আগেও সরেজমিনে তদন্ত করা হয়েছে। অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণের অভিযোগে একাধিক নোটিশ দিয়ে অতিরিক্ত নির্মাণ অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ নোটিশে এ জন্য ৩০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো বললেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা অনুযায়ী অতিরিক্ত নির্মাণ অপসারণ করা না হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে ইমারত নির্মাণ কমিটি সিদ্ধান্ত দেবে।

