নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

বাংলাদেশ

ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স

মার্চ ৬, ২০২৪ ৪:২৪ 👁️ ৭৩ views
Link Copied!

এম জসীম উদ্দিন :নিজের এবং অন্যের আবেগ বুঝতে পারা, অনুভূতির সূক্ষ্মতর রূপগুলো সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারা এবং কোনো পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেয়া বা কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতাই হলো ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্স। এক কথায় অনুভূতির সূক্ষ্ম রূপগুলো নিয়েই ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সএর কাজ। অন্যভাবে বলতে গেলে, ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স হচ্ছে ব্যক্তির এমন দক্ষতা যা দ্বারা ব্যক্তি নিজের এবং আশেপাশের মানুষদের আবেগ বুঝতে পারেন। ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স সমৃদ্ধ মানুষ শুধু আবেগই বুঝতে পারেন না বরং তা ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে পারেন।

কর্মক্ষেত্র তথা ব্যক্তিগত জীবনে কতটা দূরদর্শী পদক্ষেপ নেয়া যায় এবং আকস্মিক বিভিন্ন ঘটনায় নিজেকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এই বিষয় গুলোর উপর ব্যক্তির সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে। সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় প্রায় প্রতিটা মানুষেরই সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকলেও, আবেগ, রাগ, ও বিভিন্ন মানসিক অবস্থার কারণে তা ব্যাহত হতে পারে। ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স এমন একটি বিষয় যা ব্যক্তিকে, বিভিন্ন মানসিক অবস্থাতেও শান্ত এবং বিচক্ষণ রাখতে পারে ৷

আবেগগত শক্তির ধারণাটি আব্রাহাম মাসলো ১৯৫০ এর দশকে চালু করেছিলেন। “আবেগজনিত বুদ্ধিমত্তা” শব্দটি প্রথম ১৯৬৪ সালে মাইকেল বেলডকের একটি গবেষণাপত্রে এবং ১৯৬৬ সালে বি. লিউনারের ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ম্যানসিপেশন শিরোনামের গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয় যা সাইকোথেরাপিউটিক জার্নাল প্র্যাকটিস অফ চাইল্ড সাইকোলজি অ্যান্ড চাইল্ড সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত হয়ছিল। ১৯৮৩ সালে, হাওয়ার্ড গার্ডনারের ফ্রেম অফ মাইন্ড: দ্য থিওরি অফ মাল্টিপল ইন্টেলিজেন্স এই ধারণাটি প্রবর্তন করে যে ঐতিহ্যগত ধরনের বুদ্ধিমত্তা, যেমন আইকিউ, জ্ঞানীয় ক্ষমতাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়। তিনি একাধিক বুদ্ধিমত্তার ধারণার সূচনা করেছিলেন যার মধ্যে আন্তঃব্যক্তিক বুদ্ধিমত্তা (অন্যান্য ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য, প্রেরণা এবং আকাঙ্ক্ষা বোঝার ক্ষমতা) এবং অন্তঃব্যক্তিক বুদ্ধিমত্তা (নিজেকে বোঝার ক্ষমতা, একজনের অনুভূতি, ভয় এবং প্রেরণা উপলব্ধি করার ক্ষমতা) উভয়ই অন্তর্ভুক্ত ছিল।

১৯৮৫ সালে Wayne Leon Payneনামে এক পিএইচডি গবেষক তার ডক্টরেট ডিগ্রির “A Study of Emotion: Developing Emotional Intelligence; Self Integration; Relating to Fear, Pain and Desire”শীর্ষক গবেষণাপত্রে প্রথমবারের মতো ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স শব্দটি ব্যবহার করেন। সেখানে তিনি বলেন যে, সভ্য সমাজে আমরা প্রায়ই আমাদের আবেগকে লুকিয়ে রাখি, যা আমাদের আবেগের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে এবং এটি আমাদের আবেগ সংক্রান্ত অজ্ঞতার জন্যও দায়ী। Wayne LeonPayneএর গবেষণা পত্রে শব্দটি প্রথম পাওয়া গেলেও ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স এর জনক ধরা হয় John Mayer ও PeterSalovey’কে। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির Saloveyএর গবেষণার বিষয় ছিল আবেগ ও আচরণ আর ইউনিভার্সিটি অফ নিউ হ্যাম্পশায়ারের Mayerএর গবেষণার বিষয় ছিল আবেগ ও চিন্তার মধ্যকার সম্পর্ক। গ্রীষ্মের এক দিনে এই দুই বন্ধু Salovey’র বাড়ি রঙ করতে করতে ইন্টেলিজেন্স বা বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করছিলেন। কথায় কথায় তাদের মনে হল যে, বুদ্ধিমত্তার কোনো সংজ্ঞাতেই আবেগকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। কিন্ত কিছু মানুষ অন্যের আবেগ সহজে বুঝতে পারে ও সে সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে অধিক দক্ষতা প্রকাশ করে। তখন তাদের নতুন এক ধরনের বুদ্ধিমত্তার কথা মাথায় আসে যার মূল ভিত্তি হবে প্রতিদিনকার আবেগ অনুভূতিকে সনাক্ত করা, তা সঠিকভাবে ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করা। এই চিন্তা থেকেই তারা ১৯৯০ সালে “ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স” নামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এখানে তারা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স এর সংজ্ঞায়ন করেন ও এর একটি ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো প্রদান করেন এভাবে,“এটি এক প্রকারের সামাজিক বুদ্ধিমত্তা যার মধ্যে নিজের ও অন্যের আবেগ-অনুভূতি সতর্কতার সাথে লক্ষ্য করা, তাদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারাও এই তথ্য দ্বারা নিজের চিন্তা ও কাজকে পরিচালিত করা অর্ন্তভুক্ত”।

জীবনের প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স এর গুরুত্ব অনেক সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না, তবে বর্তমান বিশ্বে প্রফেশনাল লাইফে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স কে অন্যতম স্কিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বড়ো বড়ো কোম্পানির বিভিন্ন রিপোর্ট বলছে প্রতিষ্ঠানের নিম্ন পর্যায়ে কাজ করা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স সমৃদ্ধ ব্যক্তিরা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা, বিক্রয় তথা ওভারঅল বৃদ্ধিতে ব্যাপক অবদান রাখছে। এবং খুব তাড়াতাড়ি নিজেদেরকে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বলা যায় প্রফেশনাল লাইফ অথবা কর্মক্ষেত্রে নিজেকে এগিয়ে রাখতে সাহায্য করতে পারে এই ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স।প্রতিটি মানুষ নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ গুণ নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও বাদ বাকি গুণাবলি, শিক্ষা ও চর্চার মধ্যমে অর্জন করতে হয়। মানুষের মধ্যে শুরু থেকেই ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স থাকতে পারে তবে যদি সেটার সঠিক চর্চা না হয় তাহলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এই বিশেষ স্কিল থেকে সুবিধা নিতে পারবে না।

ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বাড়তে হলে, প্রথমে নিজেকে যেকোনো বিষয় বুঝার সময় দিতে হবে। কোনো কনভারসেশনে যখন কেউ কথা বলবে, তখন তার কথার মাঝে কথা না বলে, তাকে শেষ করার সময় দিতে হবে এবং এই সময়টিতে তিনি কী কী বলছেন তা মাথায় রাখতে হবে। তাঁর কথার জবাব কী হবে এই সময়ের মধ্যে ভেবে উপযুক্ত জবাবটি নির্ধারণ করতে হবে। তাড়াহুড়ো করা যাবে না। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে এমন কোনো কথা বলে ফেলতে পারেন যার জন্য পরবর্তীতে অনুতপ্ত হতে হবে। হটাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনায় বিচলিত হয়ে যাওয়া, কারো কথায় রেগে যাওয়া, স্বাভাবিক মানুষের লক্ষণ কিন্তু যখন কেউ নিজের মধ্যে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বাড়াতে চাইবে তখন এই ধরনের কাজ করা যাবে না। ব্যক্তিকে জানতে হবে বিরূপ পরিস্থিতিতেও কীভাবে নিজেকে শান্ত রাখতে হয়। রাগের মথায় এবং অতিরিক্ত আবেগের সময় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না। ইমোশনালি কোনো সিদ্ধান্ত নিলে এটি পরবর্তীতে বড়ো সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই এমন কোনো ঘটনায় প্রথম কাজ হবে নিজেকে শান্ত করা এবং ১০-২০ মিনিট একা বসে বিষয়টি নিয়ে ভাবা। যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে নিজেকে তিন প্রশ্ন করতে হবে। কমেডিয়ান Craig Fergusonতার এক সাক্ষাৎকারে তিনটি প্রশ্নের কথা উল্লেখ্য করেছেন, যেগুলো ব্যক্তির ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স এর পরিচয় দেবে। এটি কি বলা দরকার? এটি কি আমাকে বলতেই হবে? এটি আমাকে এখনি বলতে হবে? জবাবের আগে অবশ্যই এই তিনটি প্রশ্ন নিজেকে করলে হয়তো পরবর্তীতে আফসোস করতে হবে না। একজন ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স সমৃদ্ধ ব্যক্তি সঠিকভাবে তার Attitudeবা মনোভাবকে ব্যবহার করতে পারে। যে কোনো বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব কোনো কাজ করতে যেমন বাধা দিতে পারে অন্যদিকে ইতিবাচক মনোভাব এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। সমালোচনাকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারার উপর ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বৃদ্ধি অনেকাংশেই নির্ভর করে। উচ্চ ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স সমৃদ্ধ ব্যক্তিরা, অন্যের কাছে নিজের সমালোচনা শুনে হটাৎ করেই ক্ষুব্ধ না হয়ে সময় নেয় এবং ভাবে তারপর ইতিবাচাক প্রতিক্রিয়া দেন। আর তাই নিজের সমালোচনায় প্রতিবাদ না করে এর কারণ খুঁজে বের করে নিজের নেতিবাচক দিকগুলো থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে পাশাপাশি সমালোচনাকে সংশোধনের পথ হিসেবে চিন্তা করতে হবে।

ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স মানব জীবনের একটি চলমান প্রক্রিয়া, ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স মূলত মানুষের আবেগ-অনুভূতি আর বুদ্ধিমত্তার এক অনন্য মেলবন্ধন। নিজের ও অন্যের অনুভূতি বোঝা এবং সে অনুযায়ী আচরণ করাই হলো ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের মূল কথা। আর এই দক্ষতা যে শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য দরকার তা নয়, কর্মক্ষেত্রে ভালো করার জন্যও এর কোনো বিকল্প নেই। যে যত বেশি এর চর্চা করবে তার মাঝে ততবেশি এটি প্রতিফলিত হবে। ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স চর্চার মাধ্যমে সমাজের ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটিানো সম্ভব। আর এর মাধ্যমে আমরা পেতে পারি একটি পরমতসহিষ্ণু জ্ঞানভিত্তিক সমাজব্যবস্থা।
#
লেখক: তথ্য অফিসার পিআইডি
পিআইডি ফিচার

 

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল সময়ের কথা ২৪ লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন somoyerkotha24news@gmail.com ঠিকানায়।