স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীতে একটি ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে এক নারীসহ পুলিশের কর্মকর্তা মাহবুব আলমকে দরজা ভেঙে উদ্ধার করেছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস। শুক্রবার সকালে চন্দ্রিমা থানার নাদের হাজির মোড়সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ফ্ল্যাট থেকে থানায় নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব আলম।
মাহবুব আলমের কথিত পালিত মেয়ের নামে নাদের হাজির মোড়ের ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেওয়া। সেখানে তাঁর মেয়ে ও জামাই থাকেন। তবে বৃহস্পতিবার রাত থেকে ওই ফ্ল্যাটে মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌ নামে এক নারী অবস্থান করছিলেন।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে মতে জানা যায় , সকালে ওই ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে দীর্ঘ সময় কোনো সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় মাহবুব আলম ও তাঁর সঙ্গে থাকা এক নারীকে উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাস্থলে মাহবুব আলমের আরেক স্ত্রী আন্নী আক্তারও উপস্থিত ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। সেখানে তিনি মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে একাধিক বিয়ে ও বিভিন্ন নারীর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে অভিযোগ করেন।
সানজিদা মৌ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে মাহবুব আলম দাবি করেন, সানজিদা তাঁর স্ত্রী। এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো কাবিননামা দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে অবস্থান নেওয়া আন্নি আক্তার নিজেকে মাহবুব আলমের ষষ্ঠ স্ত্রী বলে দাবি করেন। মাহবুবের দাবি, আন্নিকে চারদিন আগে তিনি তালাক দিয়েছেন।
নওগাঁর বাসিন্দা আন্নি আক্তার একজন নারী উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট নির্মাতা। তাঁর অভিযোগ, চলতি বছরের শুরুতে মাহবুব আলম তাঁকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন, মাহবুব যে জেলায় যান, সেখানেই বিয়ে করেন এবং একাধিক নারীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রয়েছে।
আন্নি বলেন, রাজশাহীর পদ্মা আবাসিক এলাকায় মাহবুবের নিজস্ব একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এর আগেও সেখানে সানজিদা মৌকে মাহবুবের সঙ্গে দুই দিন পেয়েছিলেন তিনি। তখন সামাজিক ও পারিবারিক সম্মানের কথা বিবেচনা করে বিষয়টি প্রকাশ করেননি।
আন্নির ভাষ্য, বৃহস্পতিবার রাতে তিনি জানতে পারেন, মাহবুব তাঁর কথিত পালিত মেয়ের ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাটে গেছেন। সেখানে সানজিদা মৌও রয়েছেন। খবর পেয়ে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে তিনি ওই ফ্ল্যাটে যান। দরজায় কড়া নাড়লেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন।
থানায় নেওয়ার সময় সাংবাদিকেরা মাহবুব আলমের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, আন্নিকে তিনি তালাক দিয়েছেন। পুলিশের কাছে তালাকের একটি কাগজও জমা দিয়েছেন। তবে সানজিদার সঙ্গে বিয়ের কাবিননামা তিনি দেখাতে পারেননি।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চারদিন আগে আন্নিকে তালাক দেওয়ার একটি কাগজ মাহবুব আলম দিয়েছেন। তবে আন্নি জানিয়েছেন, তিনি তালাকের কোনো কাগজ হাতে পাননি।
এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ করার কথা জানিয়েছেন আন্নি। শুক্রবার দুপুরে অভিযোগ লেখার কাজ শুরু হয়। তখন মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌকে থানার পৃথক দুটি কক্ষে রাখা হয়। মাহবুবের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবিও জানান আন্নি।
চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ছুটিতে থাকায় থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মাহমুদ সিদ্দিকী বলেন, মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌয়ের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা থানায় আসবেন। এরপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট মোস্তাক আহমেদ বলেন, তিনি কিছুক্ষণ আগে ঘটনাটি জেনেছেন। মাহবুব আলমের কোনো ছুটি নেই এবং কাউকে জানিয়েও তিনি রাজশাহীতে যাননি। অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করাও অপরাধ। তিনি বলেন, মাহবুব আলম ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত থাকলেও নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত। বিষয়টি নওগাঁ জেলা পুলিশকে জানানো হয়েছে। তারা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) ও আরএমপির মুখপাত্র গাজিউর রহমান, বলেন, ওসি মাহাবুবকে উদ্ধার করে চন্দ্রীমা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়, পরবর্তীতে ওসি মাহাবুব জানায় ফ্লাটে তার সাথে থাকা নারীটি তার বিবাহিত স্ত্রী। এবিষয়ে তার কর্মরত সিরাজগঞ্জ পুলিশকে জানানো হবে এবং তারাই ওসি মাহাবুবের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে অতীতেও অভিযোগ ওঠার তথ্য রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চন্দ্রিমা থানার ওসি থাকাকালে তাঁর দপ্তরে এক ব্যক্তির সঙ্গে খাম আদান-প্রদানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তাঁকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। ওই ঘটনায় তদন্তের কথাও জানিয়েছিল আরএমপি। মাহবুব আলম নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এরপর তাঁকে সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত করা হয়।
গত ২০২৩ সালে চারঘাট মডেল থানার ওসি থাকাকালে এক নারীর কাছে সাত লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ ওঠে মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পর তাঁকে প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তী সময়ে পুলিশের তদন্তে ছড়িয়ে পড়া অডিওটি তাঁরই কথোপকথনের বলে উল্লেখ করা হয়। তবে মাহবুব আলম তখন অডিওটি সম্পাদিত বলে দাবি করেছিলেন। ঘটনাটি নিয়ে পুলিশ বিষয়টি যাচাই-বাছাই করছে বলে গণমাধ্যমকে জানায়।

