অনলাইন ডেস্ক : একটি গানও নিজ হাতে লিখে রাখেননি। তবু মৃত্যুর ১৩৬ বছর পরও কণ্ঠে বেঁচে আছেন মরমি সাধক ও মানবতাবাদী দার্শনিক লালন ফকির। ছেউড়িয়ায় তাঁর তিরোধান দিবসের তিন দিনের উৎসব শুরু হচ্ছে শনিবার (১৭ অক্টোবর)।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেউড়িয়া আখড়াবাড়িতে ফকির লালন ফকিরের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের এ আয়োজন চলবে আগামী ১৯ অক্টোবর (সোমবার) পর্যন্ত। এবারের প্রতিপাদ্য তাঁরই গানের চরণ, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। মানুষকে কেন্দ্রে রাখার এই কথাটিই লালনের গানের মূল সুর হিসেবে পরিচিত।
এই সুরেই তিনি জাতপাত ও ধর্মীয় ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে মানুষকে স্থান দিয়েছেন। ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’ গানে তিনি নিজের জাতের পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। আবার ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’ গানে রূপকের ভাষায় খুঁজেছেন নিজ দেহ ও আত্মার রহস্য। তাঁর গানের সংখ্যা নিয়ে নানা মত থাকলেও ধারণা করা হয়, তা দুই হাজারের মতো।
এত গান টিকে থাকার পেছনে কোনো ছাপা বই ছিল না। কারণ, লালন নিজে কখনো গান লিখে রাখতেন না। শিষ্য ও ভক্তদের মুখে মুখেই গানগুলো এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছেছে।
তাঁর জীবন নিয়েও লিখিত তথ্য তেমন নেই। জন্মস্থান, জন্মসাল ও জন্মপরিচয় নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে মৃত্যুর দিনটি নির্দিষ্ট। ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক, অর্থাৎ ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ছেউড়িয়ার আখড়ায় তাঁর মৃত্যু হয়। এর ১২ দিন পর হিতকরী পত্রিকার এক লেখায় প্রথম তাঁকে ‘মহাত্মা’ আখ্যা দেওয়া হয়।
তাঁর চেহারার সাক্ষ্যও রয়েছে মাত্র একটি। ১৮৮৯ সালে শিলাইদহে বোটে বসে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের একটি প্রতিকৃতি আঁকেন। সেটিই তাঁর জীবদ্দশায় আঁকা একমাত্র ছবি হিসেবে পরিচিত।
এই উৎসবের শিকড় লালন ফকিরের জীবদ্দশায়। প্রচলিত আছে, তিনি দোলপূর্ণিমায় শিষ্যদের নিয়ে আখড়ায় সাধুসঙ্গ করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর অনুসারীরা ১ কার্তিক দিনটিকে তিরোধান দিবস হিসেবে পালন করতে শুরু করেন। সেই থেকে প্রতিবছর দোলপূর্ণিমা ও তিরোধান দিবস, এই দুই উপলক্ষে ভক্তরা আখড়াবাড়িতে মিলিত হন।
তিরোধান দিবসের আনুষ্ঠানিকতা চলে পুরোনো রীতিতেই। ১ কার্তিক অধিবাস সেবার মধ্য দিয়ে শুরু হয় অষ্টপ্রহরের সাধুসঙ্গ। পরদিন বাল্যসেবা ও পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে তা শেষ হয়।
ভক্তদের এই আয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে ষাটের দশকে। ১৯৬৩ সালে আখড়াবাড়ি ঘিরে প্রতিষ্ঠিত হয় লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্র। পরে সেটি বিলুপ্ত করে সরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় লালন একাডেমি, যেটি সরকারের স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত হয় (বর্তমানে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে এই একাডেমিই আয়োজন করে লালন স্মরণোৎসব)। এরপর ২০০৫ সালের নভেম্বরে ইউনেস্কো বাংলাদেশের বাউল গানকে মানবতার মৌখিক ও অধরা ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করে।
তবে স্বীকৃতির বহু আগে থেকেই, শত বছর ধরে তিরোধান দিবসকে ঘিরে দেশ বিদেশ থেকে ছেউড়িয়ায় ছুটে আসেন লালন ভক্ত ও অনুসারীরা। লাখো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে আখড়াবাড়ি। এবারও অনেকে দুই এক দিন আগেই এসে আসন নিয়েছেন। সেবা গ্রহণের পর নিজেদের ঘরানায় ছোট ছোট আসর বসিয়ে গানে গানে চলছে ফকির লালনের বাণীর বিনিময়। মাজার মিলনায়তনে দোতারা হাতে ভক্তরা গেয়ে চলেছেন, ‘কে বানাইলো এমন রং মহল খানা/ হাওয়া দমে দেখ তারে আসল বেনা’। এ সময় চারপাশে কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে সেই গান শুনছেন সহস্রাধিক দর্শক শ্রোতা।
আখড়াবাড়ির এক কোণে আসন নেওয়া ফকির রশিদ শাহ বাসসকে বলেন, প্রশাসন তাদের মতো করে প্রচলিত অনুষ্ঠান করবে। তবে মূল ভুলে নকল নিয়ে ব্যস্ত থাকলে অতৃপ্ত আত্মা নিয়েই ফিরতে হবে। তাই সাঁইজির বাণীতে আত্মার শান্তি পেতেই তারা বারবার এখানে আসেন।
লালন সাধক ফকির হৃদয় শাহের কাছে এই আসরগুলোই উৎসবের প্রাণ। তিনি বলেন, দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন- ‘নিজেকে জানো’, সাঁইজির বাণীতেও সেই মানবতা ও মনুষ্যত্বের আলো ছড়িয়ে আছে। এখন অনেক শিক্ষিত মানুষও লালন দর্শন অনুসরণ করছেন। আড়ম্বর নয়, সহজ মানুষের সহজ আনন্দ আর সাধুসঙ্গের মধ্যেই এ উৎসবের তাৎপর্য নিহিত।
এদিকে আখড়ার আসরের পাশাপাশি চলছে আনুষ্ঠানিক আয়োজনও। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের আয়োজনে আজ সন্ধ্যায় লালন একাডেমি চত্বরে উৎসবের উদ্বোধন করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি। সভাপতিত্ব করবেন লালন একাডেমির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান। আলোচনা শেষে গভীর রাত পর্যন্ত লালন মঞ্চে গান পরিবেশন করবেন দেশের খ্যাতিমান বাউল শিল্পীরা।
জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান বলেন, ‘প্রতিবারের মতো এবারও তিন দিনব্যাপী তিরোধান দিবস উদ্যাপনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’- বাসস

