স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। এ সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে ৪৮ ঘণ্টা এবং প্রয়োজনে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা। পাঁচ দফা দাবিতে বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া কর্মবিরতি চলাকালে সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা। এতে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, বিকল্প চিকিৎসক দিয়ে সেবা চালু রাখা হয়েছে, ফলে রোগীদের ভোগান্তি হচ্ছে না।
বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে হাসপাতালের অভ্যন্তরে অবস্থিত চারু মামার ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইন্টার্ন ডক্টরস সোসাইটির সভাপতি ডা. সাদাত মাহমুদ তপু বলেছেন, রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রের। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী না থাকলে চিকিৎসকদের পক্ষে যথাযথ সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বললেন, রামেক হাসপাতাল ১ হাজার ৩০০ শয্যার হলেও প্রতিদিন এখানে ৪ থেকে ৫ হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। নির্ধারিত শয্যাসংখ্যার রোগীদের জন্যও সরকারি বরাদ্দ ও সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। অতিরিক্ত রোগীর চাপের মধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে।
ডা. সাদাত মাহমুদ তপু বললেন, ‘আমাদের কর্মসূচি রোগীকেন্দ্রিক। রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সেবা পাচ্ছেন না। হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা ও সরবরাহের ঘাটতির দায় চিকিৎসকদের ওপর পড়ছে। এতে রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসকদের ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হচ্ছে। রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে।’
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অভিযোগ, গত দুই থেকে তিন মাস ধরে হাসপাতালে ন্যূনতম চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট চলছে। ক্যানুলা, সিরিঞ্জ ও স্যালাইনের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রীও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। জরুরি ওষুধের অভাবে চিকিৎসা দিতে বিলম্ব হচ্ছে, যা রোগীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
ইন্টার্ন ডক্টরস সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মুশফিকুর রহমান বলেছেন, চিকিৎসকেরা ব্যবস্থাপত্র দিলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সামগ্রী না থাকায় রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। নার্সরা হাসপাতালের সরবরাহ থেকে ওষুধ দিতে না পারার কথা জানালে রোগী ও স্বজনদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয় চিকিৎসকদের। তিনি বললেন, ‘গত দুই থেকে তিন মাস ধরে আমরা ন্যূনতম চিকিৎসাসামগ্রী পাচ্ছি না। ক্যানুলা, সিরিঞ্জ ও স্যালাইনের মতো জরুরি সামগ্রীও দিতে পারছি না। ২৮ দিনের কোনো নবজাতকের খিঁচুনি হলে জরুরি ওষুধ দিতে দেরি হওয়া তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অথচ ওষুধ না থাকায় বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে। এতে ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় লেগে যাচ্ছে।’ তিনি আরো বললেন, তাঁদের কর্মসূচি বেতন বৃদ্ধি বা বিসিএসে আবেদনের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবিতে নয়। রোগীদের মৌলিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই তাঁদের লক্ষ্য। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত না হলে তাঁরা প্রথমে ৪৮ ঘণ্টা এবং পরে প্রয়োজনে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে যাবেন।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করা, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা জোরদার, ক্যাজুয়ালটি বিভাগ চালু, হাসপাতালে আনসার সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রধান ফটকে অ্যাটেনডেন্ট নিয়োগ। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, রোগীর স্বজনদের অবাধ প্রবেশ ও নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁদের দাবি, হাসপাতালের অবজারভেশন রুম ও ক্যাজুয়ালটি বিভাগ চালু না থাকায় ভর্তি ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে।
তবে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, দাবিগুলোর কয়েকটি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেছেন, ‘কর্মবিরতির আগে হাসপাতাল পরিচালকের সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের একাধিক বৈঠক হয়েছে। ক্যাজুয়ালটি বিভাগ চালু, আনসার বাড়ানো, প্রধান ফটকে অ্যাটেনডেন্ট রাখা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবির সঙ্গে আমরা একমত। কিছু বিষয় মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত।’ তিনি আরো বললেন, ক্যাজুয়ালটি বিভাগ চালুর বিষয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের জানানো হয়েছে। ১০০ জন আনসার সদস্য বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসাসামগ্রীর কিছু চালান পার্শ্ববর্তী দেশ ও চীন থেকে আসে। সেগুলো পৌঁছাতে প্রায় ১৫ দিন লাগতে পারে। এ সময়ের জন্য স্থানীয়ভাবে সরঞ্জাম সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ডা. শেখ শামীম আহমেদ আরও বললেন, ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা কর্মবিরতিতে গেলেও রোগীদের চিকিৎসাসেবা চালু রয়েছে। তাঁদের পরিবর্তে সহকারী অধ্যাপকসহ অন্যান্য চিকিৎসকের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এতে রোগীদের ভোগান্তি হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শুক্রবার পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে জানিয়ে তিনি বললেন, এ সময়ের মধ্যে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা কাজে যোগ না দিলে হাসপাতাল পরিচালক প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

