অনলাইন ডেস্ক: বিএনপির অনুমোদন না নিয়েই জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সদস্য সচিব পরিবর্তন নিয়ে সংগঠনটির অভ্যন্তরে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন কিংবা স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়া অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যদের পদায়ন, অব্যাহতি বা বহিষ্কারের ক্ষমতা কারও নেই। ফলে ওলামা দলের সদস্য সচিব মাওলানা মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারকে সরিয়ে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাওলানা মো. সেলিম রেজাকে ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া বৈধ হয়নি। এ নিয়ে সংগঠনটির মধ্যে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপির চেয়ারপারসনের নির্দেশ অনুযায়ী দলের মহাসচিব অঙ্গসংগঠনের কমিটি অনুমোদন দিয়ে থাকেন। বিএনপির অন্যতম অঙ্গসংগঠন ওলামা দলের গঠনতন্ত্রেও সাংগঠনিকভাবে সাধারণ সম্পাদক/সদস্য সচিবকে অব্যাহতি দেওয়া কিংবা কাউকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক/সদস্য সচিব করার কোনো বিধান নেই। তা ছাড়া ওলামা দলের যে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক সেলিম রেজাকে ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব করা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে গত ২৩ জানুয়ারির সে সভাটি ছিল প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৮৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা।
ওলামা দলের বেশ কয়েকজন নেতা বলেন, বিএনপির হাইকমান্ডকে অন্ধকারে রেখে সংগঠনের সদস্য সচিবকে বদলানো হয়েছে। এ ঘটনা দল পরিচালনায় সরাসরি চেয়ারম্যানের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল। বিষয়টিকে অগঠনতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে আহ্বায়ক মাওলানা শাহ মো. নেছারুল হকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে গত ২৬ জানুয়ারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করেছে ওলামা দলের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটের ৫১ নেতা।
জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব (দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত) রুহুল কবির রিজভী কালবেলাকে বলেন, ‘ওলামা দলে যেভাবে রদবদল করা হয়েছে সেটা তারা করতে পারেন না, পার্টির প্রসিডিউর অনুযায়ী তারা ঠিক করেনি। বিষয়টি দলের হাইকমান্ডকে জানানো হবে। তারপর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এ ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেবেন।’
গত ২৫ জানুয়ারি ওলামা দলের আহ্বায়কের স্বাক্ষরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক সংগঠনের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাওলানা মো. সেলিম রেজাকে কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়কের শূন্য পদে ১৬ জনকে পদায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক মাওলানা মাহমুদুল হাসান শামীম ও কেন্দ্রীয় সদস্য মাওলানা আবু বকর শিবলীকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ওলামা দলের কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়।
তবে মহানগর উত্তর-দক্ষিণের নতুন কমিটি এবং কেন্দ্রীয় শূন্যপদ পূরণে ওলামা দলের আহ্বায়কের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ এনেছেন সংগঠনের অনেক নেতা। অভিযোগ অস্বীকার করে শাহ নেছারুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘সংগঠনকে গতিশীল করতে কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক যোগ্যদের দিয়ে মহানগরের কমিটি এবং কেন্দ্রীয় শূন্যপদ পূরণ করা হয়েছে।’
ওলামা দলের সদস্য সচিব নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ এনে সংগঠনটির আহ্বায়ক বলেন, ‘গত ২৮ অক্টোবরের পর থেকে ওলামা দলের সদস্য সচিবকে দলীয় কর্মকাণ্ডে পাওয়া যায়নি। এমনকি তার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এতে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে অসুবিধা হচ্ছিল। বিষয়টি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে জানানো হয়। এরপর সংগঠনকে গতিশীল করার স্বার্থে নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তে সেলিম রেজাকে ওলামা দলের ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব করা হয়েছে।’
বিএনপির হাইকমান্ডের অনুমোদন ছাড়া দলের কোনো অঙ্গসংগঠন এভাবে নিজেরা কমিটির সদস্য সচিব বদল করতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি ওলামা দলের আহ্বায়ক শাহ নেছারুল হক। তিনি বলেন, ‘ওলামা দলে এই পদায়ন ও অব্যাহতির বিষয়টি পরে বিএনপির হাইকমান্ডকে জানানো হয়েছে।’
তবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ অস্বীকার করে নজরুল ইসলাম তালুকদার কালবেলাকে বলেন, ‘গণমাধ্যমে দেখলাম একজনকে ওলামা দলের ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব মনোনীত করা হয়েছে। এ ধরনের এখতিয়ার তাদের নেই। দলের গঠনতন্ত্র অনুসারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কিংবা তার নির্দেশক্রমে দলের মহাসচিব কমিটি অনুমোদন দিতে পারেন। অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির কাউকে অব্যাহতি কিংবা কাউকে পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষমতাও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশ ছাড়া এ ধরনের রদবদল গঠনতন্ত্রবিরোধী ও বেআইনি। ওলামা দলের নির্বাহী কমিটির কোনো সভাও হয়নি। ওলামা দলকে একক কর্তৃত্বে নিতে আহ্বায়ক সাহেব বেআইনিভাবে এ কাজ করেছেন। বিষয়টি চেয়ারম্যান মহোদয়কে অবহিত করা হয়েছে।’
তিনি নিজেকে ওলামা দলের সদস্য সচিব দাবি করে বলেন, ‘প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে আমি ছিলাম এবং আছি।’
ওলামা দলের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত মাওলানা মাহমুদুল হাসান শামীম বলেন, ‘ওলামা দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে কাউকে পদায়ন কিংবা অব্যাহতি দেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের। কিন্তু চেয়ারম্যান মহোদয়কে এক প্রকার অন্ধকারে রেখে সংগঠনে এই রদবদল করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দল পরিচালনায় সরাসরি চেয়ারম্যানের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। পরে ওলামা দলের পথ ধরে একই ধরনের কার্যক্রম অন্য অঙ্গসংগঠনও করতে থাকলে দলের ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকবে।’
২০১৯ সালের ৫ এপ্রিল শাহ মো. নেছারুল হককে আহ্বায়ক এবং নজরুল ইসলাম তালুকদারকে সদস্য সচিব করে ১৭১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপুর পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আহ্বায়ক কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত করে পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় পাঁচ বছরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি।
জানা গেছে, ওলামা দলের সাংগঠনিক জেলা ইউনিট ৭২টি। এর মধ্যে ৬৬টি জেলায় আহ্বায়ক এবং মানিকগঞ্জ জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি রয়েছে। বাকি পাঁচটি জেলায় কোনো কমিটি নেই সংগঠনটির। মানিকগঞ্জ ছাড়া বাকি সব জেলা কমিটির মেয়াদ ইতোমধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। গত বছরের মাঝামাঝি নাগাদ সর্বশেষ জেলা কমিটি দেয় ওলামা দল।