স্টাফ রিপোর্টার, বাগমারা : রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় কৃষকের ফসলী জমির ধান নষ্ট করে জোরপূর্বক পুকুর খনন করা হচ্ছে। এ ঘটনায় এরই মধ্যে মামলাও হয়েছে।
গত ৫ আগস্ট এর পর কিছু বিএনপি নেতা ও যুবদলের নেতৃবৃন্দ জোরপূর্বক গিলে খাচ্ছে কৃষকের জমি। বিভিন্ন স্থানে পুকুর খননের ফলে বিপাকে পড়েছে কৃষকরা। ভয়ভীতি দেখিয়ে যুবদলের নাম ভাঙ্গিয়ে তারা অবাধে পুকুর খনন করছে। প্রতিবাদ করতে গেলেই দেয়া হচ্ছে হুমকি। পুকুর খননের ঘটনায় মূর্তিমান আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে জেলা ও উপজেলা যুবদলের নেতৃবৃন্দ। এদিকে বাগমারা উপজেলার শুভডাঙ্গা ইউনিয়নের খোর্দ্দকৌর এলাকার কৃষকের জমি জোরপূর্বক দখল করে পুকুর খননের অভিযোগ উঠেছে যুবদলের দ্বায়িত্বশীল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। তারা বাগমারার নিমাই বিলে প্রায় ৬০ বিঘা ধানি জমিতে রাতের আঁধারে এস্কেভেটর মেশিন ব্যবহার করে পুকুর খনন করছেন রাজশাহী জেলা যুবদলের সদস্য সচিব রেজাউল করিম টুটুল সহ কয়েকজন যুবদল নেতা এবং তার সহযোগীরা। তারা কৃষকের জমিতে জোরপূর্বক পুকুর খনন করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এদিকে এ ঘটনায় টুটুলসহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে আফাজ উদ্দিন প্রামাণিক নামের এক কৃষক আদালতে মামলা করেছেন। এছাড়া পুকুর খনন চক্রের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। রাজশাহীর পরিবেশবাদী একটি সংগঠনের পক্ষ থেকেও স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, নিমাই বিলের প্রায় ৩০ জন কৃষকের ৬০ বিঘা কৃষি জমিতে পুকুর খননের কাজ করছে। তাদের কেউই জমিতে পুকুর খননের অনুমতি দেননি। তারপরও জোরপূর্বক পুকুর খনন করা হয়েছে। বাধা দেওয়ায় যুবদলের নেতাকর্মীরা হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। এর ফলে ভুক্তভোগী কৃষক এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা চরম আতঙ্কে রয়েছেন। জমি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।
এদিকে গত ১৯ মার্চ আফাজ উদ্দিন প্রামাণিক নামের এক কৃষক জেলার জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করা মামলায় যুবদল নেতা রেজাউল করিম টুটুলকে প্রধান আসামি করেছেন। মোট ১১ আসামির মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন- বাগমারার তাহেরপুর পৌর যুবদলের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আরিফ, তাহেরপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা শরিফুজ্জামান শরিফ, ভবানীগঞ্জ পৌর যুবদলের সাবেক সভাপতি মো. মানিক, যুবদল নেতা শাহাদাত, ইমন ও সাদ্দাম।
মামলার আরজির বরাত দিয়ে বাদীর আইনজীবী হোসেন আলী পিয়ারা বলেন, মামলার আসামিরা গত ফেব্রুয়ারি থেকে আফাজ উদ্দিন প্রামাণিকের ৯৩ শতক জমিতে পুকুর খনন শুরু করেন। বাধা দিতে গেলে তারা আফাজের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন। এ মামলার বাদীসহ অন্য ভুক্তভোগী কৃষকেরা বাগমারা থানা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) শরণাপন্ন হলেও প্রতিকার পাননি। তাই এ মামলা করা হয়।
জোরপূর্বক জমিতে পুকুর খননের ব্যাপারে গত ৮ মার্চ আমজাদ হোসেন প্রামাণিক নামের আরেক কৃষক বাগমারা থানায় একটি জিডি করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি যুবদলের ওই নেতারা জোরপূর্বক তার জমিতে পুকুর খনন শুরু করেন। খবর পেয়ে তিনি গিয়ে বাধা দেন। এ কারণে গত ৬ মার্চ সকালে যুবদল নেতারা তার বাড়ি গিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেন। এতে তিনি চরম নিরাপত্তাহীয় রয়েছেন।
ভুক্তভোগী আমজাদ বলেন, আমার জমিতে পুকুর কাটছে, অথচ আমিই জানি না। আমার এটা ধানি জমি। এই জমির ধানই আমরা সারাবছর খাই। ওই জমি হারালে তো আমি বিপদে পড়ে যাব। চালের অভাবে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সমস্যায় পড়ব।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা যুবদলের সদস্য সচিব রেজাউল করিম টুটুল বলেন, জমি দখল করে পুকুর খননের সঙ্গে আমার ন্যূনতম সম্পৃক্ততা নেই। মামলা হওয়ার পরে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানলাম তারা চারবার সেখানে অভিযান চালিয়েছে। তারা আমার নাম পায়নি। কিন্তু হঠাৎ করে মামলায় আমাকে আসামি করা হয়েছে। জিডিতেও আমার নাম নেই। যে বা যারা এসবের সাথে সম্পৃক্ত, আমিও চাই তাদের শাস্তি হোক।
এদিকে পুকুর খননের ব্যাপারে গত ৮ মার্চ ঈশিতা ইয়াসমিন নামের আরেক নারী থানায় জিডি করেছেন। তার অভিযোগ, তাদের জমিতেও জোরপূর্বক পুকুর খনন করা হচ্ছে। বাধা দিতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এখন তিনিও পরিবার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় আছেন।
অপরদিকে নিমাই বিলে জোরপূর্বক পুকুর খননের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে জুলাই-৩৬ পরিষদ, সবুজ সংহতি ও বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের পক্ষ থেকে গত ১৩ মার্চ স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বরাবর একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।
স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, পুকুর খনন চক্র কৃষকের ধানি জমি নষ্ট করে পুকুর কাটছে। বাধা দিতে গেলে তারা কৃষকদেরই প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। এমনকি কৃষকদের ধানি জমিতে সেচ দেওয়াও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ করতে গেলে থানার ওসি উল্টো ফ্যাসিস্টদের সহযোগী তকমা দিয়ে ভুক্তভোগী এক নারীকেই গ্রেফতারের ভয় দেখান এবং মামলা নিতে আপত্তি জানান। অথচ ভুক্তভোগী সেই নারী জুলাই ৩৬ অভ্যুত্থানের একজন সম্মুখযোদ্ধা। থানার ওসি প্রভাবশালীদের পক্ষ নেন এবং তাদের সঙ্গে সমঝোতার জন্য ওই নারীকে চাপ দেন।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বাগমারা উপজেলার সাবেক যুবদলের আহবায়ক আব্দুল মালেক মালিক এ প্রতিবেদকে বলেন, পুকুর খানের সাথে কোন প্রকারের সম্পৃক্ততা আমাদের নেই। আমরা এ বিষয়ে কিছু অবগত নই। আইনগত তদন্ত সাপেক্ষে যদি কোন সংশ্লিষ্টতা পায় তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নিলে নিতে পারে।
এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ নেওয়া হয়নি এটা ঠিক নয়। অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হলেও তাদের বিপক্ষে থানায় জিডি হয়েছে। এটা আদালতে প্রসিকিউশনের জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রসিকিউশনের পর আদালতের নির্দেশনা অনুসারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বাগমারায় কৃষকের জমিতে এভাবে জোরপূর্বক পুকুর খনন সরেজমিনে গিয়ে দেখে এসেছেন জুলাই-৩৬ পরিষদের আহ্বায়ক মাহমুদ জামাল কাদেরী।
তিনি বলেন, আমরা আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে এক ফ্যাসিস্ট সরিয়েছি আরেক ফ্যাসিস্টের উত্থানের জন্য নয়। পরিবেশের ক্ষতি করে, মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং জমি দখল করে যারা সমাজে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে আমরা তাদের ছাড় দেব না। অবিলম্বে এই পুকুর খনন প্রশাসনকে বন্ধ করতে হবে।
বাগমারার ইউএনও মাহবুবুল ইসলাম বলেন, নিমাই বিলে পুকুর খনন বন্ধ করতে চারবার অভিযান চালিয়েছি। আমি এক্সকেভেটর যন্ত্র অকার্যকর করে এসেছি। আমরা খবর রাখছি।