স্টাফ রিপোর্টার : দখল, দূষণ, ভরাট ও পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতার কারণে সংকটে পড়েছে রাজশাহীর নদ-নদী। কমছে নাব্যতা, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক প্রবাহ। হুমকির মুখে পড়ছে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, প্রাণবৈচিত্র্য ও নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা। এর মধ্যে বারনই নদীতে দেশীয় মাছের ব্যাপক মৃত্যুর ঘটনায় পানিদূষণ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
বিশ্ব নদী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজশাহী নগরীর এনজিও ফোরাম মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ‘রাজশাহী জেলার নদ-নদীর সামগ্রিক অবস্থা’ শীর্ষক উপস্থাপনায় এসব চিত্র তুলে ধরা হয়। অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), রুলফাও, বস্তি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থা, উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম, মাসাউস, ঠিকানা ও সামাজিক কল্যাণ সংস্থা’র যৌথ উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়। উপস্থাপনা করেন বেলার রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সমন্বয়কারী তন্ময় কুমার সান্যাল।
সভায় সভাপতিত্ব করেন রুলফাওয়ের নির্বাহী পরিচালক আফজাল হোসেন। সম্মানিত অতিথি হিসাবে বক্তব্য দেন পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন, রাজশাহী জেলা মৎস্য কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোসা. আয়েশা খাতুন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী রিংকু প্রামানিক, দৈনিক সোনার দেশের সম্পাদক আকবারুল হাসান মিল্লাত এবং এএলআরডির প্রোগ্রাম ম্যানেজার সানজিদা খান। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বস্তি উন্নয়ন ও কর্ম সংস্থার নির্বাহী পরিচালক হাসিনুর রহমান এবং এএলআরডির বিজয় শংকর বড়ুয়া। সভায় সাংবাদিক, এনজিও প্রতিনিধি, যুব সংগঠক, কৃষক ও জেলেসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
উপস্থাপনায় পদ্মা, মহানন্দা, বড়াল, বারনই, শিব, ফকিরনী, মুসাখান, হোজা, নারদ, স্বরমঙ্গলা, বারাহী, দয়া ও সন্ধ্যাসহ ১৩টি নদীর সংকট তুলে ধরা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র উল্লেখ করে বলা হয়, রাজশাহী মহানগর এলাকায় পদ্মা নদীসংলগ্ন সহস্রাধিক অবৈধ দখলদারের তথ্য রয়েছে। ২০২২ সালে মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীতে ১ হাজার ৭৭১টি দখলস্থল এবং ৫৭ জন দখলদারের তথ্যও উপস্থাপিত হয়েছিল।
নাটোরের বড়াইগ্রাম এলাকায় ২০২২ সালে বড়াল নদীর প্রায় ৪০ কিলোমিটার অংশে ১ হাজার ১৭৮টি অবৈধ স্থাপনা শনাক্তের তথ্য তুলে ধরা হয়। স্লুইসগেট, ক্রস-ড্যাম, পলি ও কচুরিপানার কারণে নদীটির বিভিন্ন অংশে পানিপ্রবাহ ও নাব্যতা ব্যাহত হচ্ছে বলেও জানানো হয়।
এদিকে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাগমারা ও নলডাঙ্গা এলাকায় বারনই নদীতে দেশীয় মাছের ব্যাপক মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। রাজশাহী জেলা মৎস্য কার্যালয়ের সূত্রে উপস্থাপনায় পানিতে অ্যামোনিয়ার আধিক্য ও দ্রবীভূত অক্সিজেনের ঘাটতিকে মাছের মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
শিব নদীর ওপর ১০টি গ্রামের প্রায় ১ হাজার ৭৮৫টি জেলে পরিবারের নির্ভরতার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, নদী ভরাট, দূষণ ও সংযোগে প্রতিবন্ধকতা তাঁদের জীবিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নারদ নদীতে প্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী ৩৬টি স্থাপনা এবং নাটোর সদর উপজেলায় ৪৭১ জন দখলদার চিহ্নিত হওয়ার তথ্যও উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি বারাহী, স্বরমঙ্গলা ও দয়া নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ দখল, ভরাট ও নগর সম্প্রসারণের কারণে সংকুচিত হওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়।
সভায় রাজশাহী জেলা ও বিভাগের নদীর সংখ্যা ও নাম স্পষ্ট করণ, নদীর সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ, দূষণের উৎস বন্ধ, বর্জ্য শোধন নিশ্চিত করা, নদী-খাল-বিলের সংযোগ পুনরুদ্ধার এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় পুনঃখননের সুপারিশ করা হয়।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, নদীকে শুধু খনন বা পানি নিষ্কাশনের অবকাঠামো নয়, জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পানির গুণগত মান ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় দখল-দূষণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
তাঁরা নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নদী-খালের সংযোগ পুনরুদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও ধারাবাহিক কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমেই নদী রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এ প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সম্ভব। এছাড়াও রাজশাহী শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বারাহী, নবগঙ্গা, স্বরমঙ্গলা নদীগুলোর দখল-দূষণমুক্ত করতে এবং প্রবাহ ফেরাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
বিশ্ব নদী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ‘রাজশাহী জেলার নদ-নদীর সামগ্রিক অবস্থা’ শীর্ষক উপস্থাপনায় এসব চিত্র তুলে ধরা হয়।

