স্টাফ রিপোর্টার : বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের আয়োজনে সদর দপ্তর সভাকক্ষে বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে আরএমপির পুলিশ কমিশনারের আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন আরএমপির পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির পিপিএম।
উক্ত সভায় উপস্থিত বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীরা রাজশাহী মহানগরীর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, মাদকবিরোধী অভিযান, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ফুটপাত দখলমুক্তকরণ, সিসিটিভি সম্প্রসারণ এবং জনবান্ধব পুলিশি সেবা নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি রাজশাহী মহানগরীতে মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে চলমান অভিযান এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরএমপির গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসা করেন।
আরএমপির পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির পিপিএম তাদের বক্তব্যগুলো ধৈর্য্য সহকারে শুনেন এবং সকল সমস্যা সমাধানে গৃহীত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস প্রদান করেন।
এছাড়াও সাইবার অপরাধ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রসঙ্গে পুলিশ কমিশনার বলেন, বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তি কিংবা ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পরিচালিত সাইবার অপপ্রচার সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আইনি ও প্রযুক্তিগত কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাইবার আইনের আওতায় অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশনার প্রয়োজন হওয়ায় পুলিশ চাইলেই তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার বা অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে না। মেটার বাংলাদেশে নিজস্ব কার্যালয় না থাকা এবং তাদের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের কারণে প্রয়োজনীয় তথ্য পেতেও প্রায় ২০-২৫ দিন সময় লাগতে পারে। কোনো ওয়েবসাইট বা আইডি ব্লক করার বিষয়টি বিটিআরসির এখতিয়ারভুক্ত।
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অপব্যবহার, ডিপফেক, গুজব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভিউ ব্যবসা’র উদ্দেশ্যে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় আইনগত ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
জিডি তদন্তের বিষয়ে তিনি বলেন, আমলযোগ্য ও আমলঅযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া ভিন্ন। আমলঅযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে জিডি তদন্তের জন্য বিজ্ঞ আদালতের অনুমতি এবং শুনানির তারিখ নির্ধারণের প্রয়োজন হওয়ায় অনেক সময় তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটে। এটি আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হওয়ায় পুলিশকে নির্ধারিত বিধি অনুসরণ করেই ব্যবস্থা নিতে হয়।
মাদক ও জুয়া বিরোধী অভিযান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে আরএমপির অভিযান ও আইনগত পদক্ষেপ আরও জোরদার করা হয়েছে। এছাড়াও আটককৃত অপরাধীদের বিজ্ঞ আদালত সামারি ট্রায়াল ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা প্রদান করছেন। তবে অপরাধীরা দারিদ্র্যতার কারণে ও দ্রুত লাভের আশায় পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা এবং স্থানীয় জনগণের সাক্ষী হতে অনীহা-মাদক ও জুয়া সংক্রান্ত মামলায় অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মোটরসাইকেল আরোহীদের অন্তত একটি হেলমেট পরা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। অনুমোদন ব্যতীত অটোরিক্সা চার্জিং পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণে নেসকোকে পত্র দেওয়া হয়েছে এবং অটোরিক্সা ডাম্পিংয়ের জন্য নির্ধারিত স্থান খোঁজা হচ্ছে। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে আরডিএ ও সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে ফুটপাতের সঙ্গে মানুষের জীবিকা এবং সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী কেনাকাটার বিষয়টি জড়িত থাকায় এ সমস্যা সমাধানে আরডিএ ও সিটি কর্পোরেশনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
রাজশাহী মহানগরীর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, মহানগরীতে দিনে-দুপুরে বড় ধরনের বা সংঘবদ্ধ অপরাধ বলতে গেলে নেই। সংঘটিত অপরাধগুলোর অধিকাংশই পারিবারিক কলহ বা তুচ্ছ ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে সৃষ্টি হচ্ছে।
অপরাধী শনাক্তকরণ ও নজরদারি আরও জোরদার করতে সিটিকর্পোরেশনের আওতার বাহিরে মহানগরীর ৬টি থানাকে সিসিটিভি নেটওয়ার্কের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ৫টি জেলার ৯ সদস্যের একটি আন্তঃজেলা স্বর্ণ চুরি অপরাধী চক্রের ৭ জন আসামিকে গ্রপ্তার করা হয়েছে। তন্মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত ৪ জন আসামির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে।
জনবান্ধব পুলিশিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, থানায় সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ ও অভিযোগকারীরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে কমিশনারের কার্যালয় থেকে সরাসরি ফোন করে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। জনগণকে হয়রানিমুক্ত, দ্রুত ও কার্যকর পুলিশি সেবা প্রদানের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদারকি করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণ এবং জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে একটি জনবান্ধব ও দায়িত্বশীল পুলিশিং ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আরএমপির কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো: ফারুক হোসেন; উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর)-এর দায়িত্বে মোহাম্মদ খোরশেদ আলম পিপিএম; উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মোঃ নূর আলম সিদ্দিকী; উপ-পুলিশ কমিশনার (মতিহার) মাঈনুল ইসলাম, পিপিএম (বার); উপ-পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) ও আরএমপির মুখপাত্র মো: গাজিউর রহমান পিপিএমসহ আরএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীবৃন্দ।

