নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

বাংলাদেশ

ফ্যামিলি কার্ড – নারীর ক্ষমতায়নের অনন্য এক মাইলফলক

সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ ৪:১৯ 👁️ ৩৩ views
Link Copied!

হাছিনা আক্তার : একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা এবং টেকসই উন্নয়ন তখনই ‍সুফল হয়, যখন তার সুফল প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে পৌঁছায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফ্যামিলি কার্ড বিএনপির একটি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী এবং তাদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না করে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেজন্য নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করতেই ফ্যামিলি কার্ডের কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে দেশের চার কোটি পরিবারের কাছে নারী প্রধানদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। এভাবেই পাঁচ বছরে প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বত্র নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ  জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ

সরকারের উদ্দেশ্যেই হচ্ছে নারীদের ক্ষমতায়নের পাশাপাশি স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের কোটি নারীর চোখে আজ যে আত্মবিশ্বাসের আলো জ্বলছে তাই আগামী দিনে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। ফ্যামিলি কার্ড একটি ডিজিটাল ডাটাবেজভিত্তিক স্মার্ট কার্ড, এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবারগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপণ্যের পাশাপাশি সরাসরি নগদ আর্থিক সহায়তাও পাবে। এর মূল লক্ষ্য নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সমাজের প্রান্তিক, হতদরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের অর্থনৈতিক ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

এই প্রকল্পের মূল বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’ এই স্লোগান কে সামনে রেখে ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন-২০২৬’ তৈরি করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদফতর। প্রকল্পের আর্থিক ও নীতিগত দিক তদারকির জন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সরকারি নীতিমালায় বলা হয়েছে, ভূমিহীন, গৃহহীন, প্রতিবন্ধী সদস্যের পরিবার, হিজড়া, বেদে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবার ও শূন্য দশমিক ৫ একর বা তার কম জমির মলিকরা এই কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। প্রতি পরিবারের সর্বোচ্চ পাঁচজন সদস্যকে এই কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হবে। তবে একান্নবর্তী পরিবারের বেলায় প্রতি পাঁচজনের জন্য পৃথক কার্ড দেওয়া হবে। পরিবারের প্রধান নারী বা মা এই কার্ড পাবেন এবং একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা পাবেন না।

তবে সরকারি চাকরিজীবী বা নিয়মিত পেনশনভোগীরা এর আওতাভুক্ত হবেন না। এ ছাড়া বাড়িতে এসি ব্যবহারকারী, নিজস্ব গাড়ি বা বিলাসবহুল সম্পদের মালিক ও যাদের বাণিজ্যিক লাইসেন্স বা বড়ো ব্যবসা রয়েছে তারাও এই সুবিধা পাবেন না।

আরও পড়ুনঃ  প্রধানমন্ত্রী সাথে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট সাইডলাইন বৈঠক

ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিনিধিরা নির্বাচিত ওয়ার্ডে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যোগ্য পরিবার বাছাই করবেন। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওর নেতৃত্বে এবং ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সরকারি কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি এই কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ২০২৬ সালের নতুন পাইলট প্রজেক্ট অনুযায়ী কার্ডধারীরা দুই ধরনের সুবিধা পাবেন – নগদ অর্থ সহায়তা ও সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য। প্রতিটি কার্ডধারী পরিবারকে মাসে আড়াই হাজার টাকা করে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই এই টাকা সরাসরি সুবিধাভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে পৌঁছে যাবে। আরেকটি হলো এই কার্ডের মাধ্যমে বাজার দরের চেয়ে অনেক কম দামে চাল, ডাল, সয়াবিন তেল ও চিনি কেনা যাবে।

একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ মার্চ ২০২৬ এই ‘ ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি বনানী কড়াইল বস্তিতে উদ্বোধন করেন। এরপর থেকেই কর্মসূচিটি দেশের সাধারণ মানুষ তথা নারীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই কার্ড দারিদ্র্য মোকাবেলার পাশাপাশি পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অবস্থানকে মজবুত করছে।

সরকারের ছয়মাস পূর্ণ হওয়ার দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিশোরগঞ্জের সদর উপজেলায় লতিফাবাদ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচির দেশব্যাপী বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। আগামী চার বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে এই সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

আরও পড়ুনঃ  বাগমারায় প্রতিবন্ধীর কেনা জমিতে বাঁশের বেড়া দিয়ে দখলের চেষ্টা

সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং পর্যায়ে (মার্চ-জুন ২০২৬) পর্যন্ত ৮টি বিভাগের ৪২টি জেলার ৫৫টি ওয়ার্ডে ১,০৯,৬৭৯টি পরিবারের সরেজমিন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া পিএমটি স্কোরের মাধ্যমে ৭০ হাজার ৮৬১ জন পরিবার প্রধানকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা প্রদান করা হয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪.১০ কোটি পরিবার জরিপ করে তথ্য সংগ্রহপূর্বক পর্যায়ক্রমে ১০ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ধারাবাহিকভাবে সারাদেশে ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে।

প্রকৃত সুবিধাভোগী যাতে কোনোভাবেই বাদ না পড়েন এবং অযোগ্য কেউ যেন তালিকায় ঢুকতে না পারে সেজন্য ইউনিয়ন পর্যায় তথ্য যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ও অনিয়ম রোধে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। সুবিধাভোগী নিয়মিত টাকা পাচ্ছেন কিনা, সরকার তা তদারক করবে।

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০.৮৩ শতাংশ নারী হওয়ায় নারীর ক্ষমতায়ন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। প্রতিটি নারী যখন স্বাবলম্বী হবে তখনই দেশ সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ হবে। নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে জিডিপি ও বৃদ্ধি পাবে। এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে নারীর অধিকার ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে।

#লেখক: উপপ্রধান তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল সময়ের কথা ২৪ লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন somoyerkotha24news@gmail.com ঠিকানায়।