মো. নূর আলম : এদেশের মেধা, মননশীলতা ও অফুরন্ত সম্ভাবনায় ভরপুর তরুণ সমাজই আমাদের জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই যুবসমাজ। জাতীয় যুবনীতি ২০১৭ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সি যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিককে ‘যুব’হিসেবে গণ্য করা হয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই অদম্য যুবশক্তিকে সঠিকভাবে সুসংগঠিত করে দেশের মূল উন্নয়ন ধারায় সম্পৃক্ত করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়েই ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ‘যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সময়ের পালাবদলে সেই ধারাবাহিক উদ্যোগ আজ দেশের লাখ লাখ বেকার ও কর্মপ্রত্যাশী তরুণের জীবনে আত্মমর্যাদা এবং স্বাবলম্বিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে চলেছে।
আগামী ১ নভেম্বর দেশজুড়ে অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ‘জাতীয় যুব দিবস-২০২৬’। দিবসটির জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে -‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’। এই প্রতিপাদ্য কেবল কোনো গতানুগতিক স্লোগান বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে বিস্তৃত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যুবসমাজকে দক্ষ, স্বাবলম্বী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার এক সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনার প্রতিফলন।
বর্তমান বিশ্বায়নের এই যুগে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ও প্রতিযোগিতার সাথে তাল মিলিয়ে যুবসমাজকে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে নেওয়া হয়েছে আধুনিক ও বহুমুখী প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের শুরুলগ্ন থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ লক্ষাধিক যুবক ও যুব নারীকে বিভিন্ন ট্রেডে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের সফল ও গতিশীল নেতৃত্বে ইতিমধ্যে ১ লক্ষ ২৬ হাজার ২৮০ জন তরুণ-তরুণী আধুনিক প্রশিক্ষণ লাভ করেছেন। শুধু তাই নয়, চলমান ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে আরও ১ লক্ষ ৭০ হাজার ৭৭২ জন শিক্ষিত বেকার যুবকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।
প্রথাগত ও পুরোনো ট্রেডের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) এই আধুনিক যুগে যুবদের সফলভাবে সম্পৃক্ত করতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের দুয়ার উন্মুক্ত করা হয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করে, যার মাধ্যমে প্রায় ১২ হাজার তরুণকে প্রশিক্ষিত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। ইতিমধ্যে সম্পন্ন প্রথম ব্যাচের ১,৬০০ জন প্রশিক্ষণার্থীর মধ্য থেকে ৭২২ জন সরাসরি উপার্জনের সাথে যুক্ত হয়ে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছেন। একইভাবে, দেশের ৬৪টি জেলায় শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার আওতায় প্রায় ৩০ হাজার তরুণকে দক্ষ করে তোলা হয়েছে।
তাত্ত্বিক বা কারিগরি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তরুণদের ভাগ্য বদলাতে আর্থিক সহায়তা ও নীতিগত পৃষ্ঠপোষকতা অপরিহার্য। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে কর্মপ্রত্যাশী তরুণদের আত্মকর্মী ও সফল উদ্যোক্তা হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনা জামানতে ‘যুব ঋণ’ প্রদান করা হচ্ছে। যুব ঋণ তহবিলের আওতায় যুবদের একক ঋণ এবং পারিবারিক গ্রুপভিত্তিক ঋণ প্রদান করা হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১১ লক্ষ ১৪ হাজার ৬৪৪ জন যুবকের মাঝে মোট ২ হাজার ৮৬১ কোটি ৮৭ লক্ষ টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল বর্তমান সরকারের মেয়াদে ১৩,৯১৮ জনের মাঝে ১৩০ কোটি ৪ লক্ষ টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলো, এই ঋণের আদায় হার শতকরা ৯৬ ভাগে উন্নীত হয়েছে, যা আমাদের যুবসমাজের সততা, নিষ্টা, দায়বদ্ধতা ও কর্তব্যপরায়ণতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সহজ শর্তের ও বিনা জামানতের এই ঋণ সহায়তার ওপর ভর করেই দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় ২৫ লক্ষ সফল আত্মকর্মসংস্থানমূলক উদ্যোগ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবরা কেবল দেশেই নয়, বরং বিদেশেও অত্যন্ত সম্মানজনক ও লাভজনক জীবিকা খুঁজে নিচ্ছেন। বর্তমানে আত্মকর্মী যুবদের মাসিক আয় ন্যূনতম ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত এবং অনেকের মাসিক আয় লক্ষাধিক টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পোলট্রি খামার, মৎস্য চাষ, আধুনিক কৃষি, কম্পিউটার সার্ভিসিং থেকে শুরু করে ই-কমার্স এবং অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা – সব খাতেই আজ সুফল দেখতে পাচ্ছেন তরুণরা।
শুধু অর্থনীতি কিংবা প্রযুক্তির ক্ষেত্রেই নয়, দেশের চলমান পরিবেশ সুরক্ষা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় যুবদের ভূমিকা আজ সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ইতিমধ্যে প্রায় ১২ হাজার পরিবেশবান্ধব বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে এবং আরও ৩২ হাজার বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এই উদ্যোগ বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এবং গ্রামীণ জনপদে টেকসই জ্বালানি নিশ্চিতকরণে এক বিশাল ভূমিকা রাখছে।
সামাজিক সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের নিরিখে বর্তমান বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় এক অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নারী ও পুরুষের মধ্যকার জেণ্ডার সমতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠী, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন যুব এবং সমাজের তৃতীয় লিঙ্গের (ট্রান্সজেন্ডার) সম্প্রদায়কে সমাজিক ও অর্থনৈতিক মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যুব কার্যক্রমে তাদের সর্বাত্মক প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এই বিশেষ জনগোষ্ঠীর জন্য যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সকল কোর্সের ভর্তি ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় যুব পুরস্কার প্রদান কিংবা অন্যান্য সরকারি কার্যক্রমেও তাদের জন্য বিশেষ কোটা সংরক্ষণ করা হয়েছে।
যুবসমাজের সুসংগঠিত শক্তি ও নেতৃত্ব বিকাশের পথকে আরও সুদৃঢ় করতে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোকে সময়োপযোগী করা হয়েছে। ‘যুব সংগঠন (নিবন্ধন ও পরিচালনা) আইন’ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার আওতায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর জুন ২০২৬ পর্যন্ত ২৬৭৮টি যুব সংগঠনকে স্বীকৃতি এবং ৬৫০০-এর অধিক সংগঠনকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন প্রদান করেছে। এর বাইরেও অধিদপ্তরের পূর্বের তালিকাভুক্ত প্রায় ১৫,৭৮০টি যুব সংগঠন রয়েছে, যার ফলে নিবন্ধিত মোট যুব সংগঠনের সংখ্যা বর্তমানে ২৫ হাজারের অধিক। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে গঠিত হয়েছে ‘যুব কল্যাণ তহবিল’। এই তহবিলের আওতায় এ পর্যন্ত ১৮ হাজার যুব সংগঠনকে মোট ৪৫ কোটি ৩৩ লক্ষ ২৬ হাজার টাকা প্রকল্পভিত্তিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদেও ৩৪২টি যুব সংগঠনকে ৩ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে, যা জাতীয় সংকটকালে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে যুবদের অনুপ্রাণিত করে। পাশাপাশি তরুণের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে অতি দ্রুত গঠিত হতে যাচ্ছে ‘জাতীয় যুব কাউন্সিল’।
আগামী ১ নভেম্বর সকালে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর উপস্থিতিতে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হবে মূল অনুষ্ঠান। উক্ত অনুষ্ঠানে যুব উন্নয়ন ও আত্মকর্মসংস্থানে অসামান্য ও অনুকরণীয় অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ৪ জন সফল যুব সংগঠক এবং ১০ জন সফল আত্মকর্মী—মোট ১৪ জনের হাতে তুলে দেওয়া হবে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি ‘জাতীয় যুব পুরস্কার ২০২৬’।
এবারের যুব দিবসের সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয় আয়োজন হলো বিশাল পরিসরে আয়োজিত জব ফেয়ার বা চাকরি মেলা। আগামী ১ নভেম্বর ৫৫টি স্বনামধন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে এই মেলা অনুষ্ঠিত হবে। এই মেলার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে প্রায় ৫ হাজার কর্মপ্রত্যাশী যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। এর পাশাপাশি, মেলা চলাকালীন কমপক্ষে ১০০ জন যোগ্য তরুণকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরির নিয়োগপত্র প্রদান করা হবে।
যুবসমাজের কর্মসংস্থান ও বহুমুখী দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে টেকনোলজি এমপাওয়ারমেন্ট সেন্টার অন হুইলস ফর আণ্ডারপ্রিভিলেজড রুরাল ইয়াং পিপল অব বাংলাদেশ (টেকাব ২য় পর্যায়), দারিদ্র্যবিমোচনের লক্ষ্যে ব্যাপক প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইমপ্যাক্ট (৩য় পর্যায়), লাইফ স্কিলস এডুকেশন ইন ইয়ুথ ট্রেনিং সেন্টার (LYTC & SNYP), ইকোনমিক অ্যাকসিলারেশন অ্যাণ্ড রেজিলিয়েন্স ফর নিট (EARN) প্রজেক্ট এবং কক্সবাজারে নারী ও যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নে আইএসইসি (ISEC) প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি, উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ জোরদার, আধুনিক যানবাহন চালনা, কেয়ারগিভার তৈরি, ই-কমার্সে পণ্য বিপণন, ফ্রিল্যান্সিং ও বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প গ্রহণের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
পরিশেষে বলাই যায়, সরকারের নানামুখী যুববান্ধব নীতি, আধুনিক প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পগুলোর সঠিক ও সময়োপযোগী বাস্তবায়নের ফলে দেশের যুবসমাজ আজ হতাশার চাদর সরিয়ে সাফল্যের আলোর পথ দেখতে শুরু করেছে। এদেশের কোটি তরুণের হাতে আজ সুসংগঠিতভাবে তুলে দেওয়া হয়েছে স্বাবলম্বিতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির চাবিকাঠি। এই অদম্য যুবশক্তির সুদৃঢ় হাত ধরেই অচিরেই প্রতিষ্ঠিত হবে একটি ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, আত্মমর্যাদাশীল এবং উন্নত বাংলাদেশ।
#লেখক- তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর, তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসাবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত

