পলাশ পাল, নেত্রকোনা : একজন সাংবাদিকের হাতে কেবল একটি কলম, নোটবুক কিংবা ক্যামেরা থাকে না—থাকে সাধারণ মানুষের মনে জমে থাকা অজস্র প্রশ্ন, ক্ষোভ আর প্রত্যাশাকে সামনে তুলে ধরার এক সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা। সাংবাদিকতা স্রেফ আট-দশটা সাধারণ পেশার মতো কোনো চাকরি নয়; এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে একটি স্বচ্ছ আয়না হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সেই আয়নাতেই যখন ভয় আর শঙ্কার বাষ্প জমে, তখন সত্যের প্রতিচ্ছবিটা ধোঁয়াটে ও ঝাপসা হয়ে যায়।
যখন একজন সাংবাদিক কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন বা কলাম প্রকাশের আগে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও অনিরাপত্তায় ভুগে নিজের ওপর একটি অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেন, তখনই জন্ম নেয় ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা আত্ম-সংবেদনশীলতা। বস্তুনিষ্ঠ তথ্য হাতে থাকা সত্ত্বেও প্রকাশের আগেই তাঁর মনে ঘুরপাক খেতে থাকে কতগুলো উদ্বেগজনক প্রশ্ন—
“এই লেখাটি ছাপা হলে প্রভাবশালী কারও অসন্তোষ তৈরি হবে কি?”
“কোনো কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বা কর্তৃপক্ষ কি আমার ওপর ক্ষুব্ধ হবে?”
“এর খেসারত হিসেবে আমার চাকরি, ক্যারিয়ার কিংবা জীবন ও নিরাপত্তার ওপর কোনো চরম আঘাত নেমে আসবে না তো?”
অবশ্যই অপরিপক্ব বা অবিন্যস্ত তথ্য হুট করে প্রকাশ করে দেওয়া দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিচয় নয়। তথ্যের নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাই, দেশের প্রচলিত আইন, সামাজিক সংবেদনশীলতা এবং পেশাগত নৈতিকতার সীমা মেনে চলা সাংবাদিকতারই অংশ। কিন্তু ভুল তথ্য বা নীতিমালার কারণে নয়—বরং ভয়, অদৃশ্য রাজনৈতিক বা কর্পোরেট চাপ এবং সম্ভাব্য আক্রমণের আশঙ্কায় যখন সত্য ও জনস্বার্থের মূল প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যায়, তখন পুরো সমাজ এক কঠিন অন্ধকারে তলিয়ে যেতে থাকে।
এখানে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি হলো—অনেকে ভাবেন সেলফ-সেন্সরশিপ বোধহয় কেবল একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত বা পেশাগত সীমাবদ্ধতা বা ব্যক্তিগত সুরক্ষার কৌশল। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাংবাদিকের কণ্ঠ রুদ্ধ হলে কিংবা কলম থমকে গেলে সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হয় দেশের সাধারণ জনগণকে।
সঠিক খবর না পাওয়ার অর্থ হলো সাধারণ মানুষের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা খর্ব হওয়া। যখন তথ্য চেপে যাওয়া হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণের সংবিধানপ্রদত্ত ‘জানার অধিকার’ এবং ভেঙে পড়ে রাষ্ট্রের জবাবদিহির মূল ভিত্তি। দুর্নীতির খবর যখন চাপা পড়ে, তখন দুর্নীতিগ্রস্তরা পায় আরও আশ্রয়; আর শোষিত মানুষ হারিয়ে ফেলে তাদের পক্ষে কথা বলার শেষ আশ্রয়টুকুও।
একটি সুস্থ, প্রগতিশীল ও স্বাধীন সমাজে সাংবাদিকের ধারালো প্রশ্ন বা সমালোচনাকে ভয়, হুমকি কিংবা দমন-পীড়ন দিয়ে রুদ্ধ করা কোনো সভ্যতার লক্ষণ হতে পারে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে হয় যুক্তি, স্বচ্ছতা ও সঠিক তথ্য দিয়ে।
আমাদের সবসময় একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন—সাংবাদিকের কণ্ঠ ও কলম যতখানি স্বাধীন ও মুক্ত থাকবে, জনগণের সত্য জানার শক্তি এবং একটি গণতান্ত্রিক সমাজ হিসেবে দেশের ভিত্তি ততটাই শক্তিশালী হয়ে উঠবে। সাংবাদিকের নীরবতা কেবল একটি সংবাদের মৃত্যু নয়, তা একটি সচেতন সমাজের বাক্স্বাধীনতার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত।

