নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

বাংলাদেশ । । ।

অচেনা উপসর্গ নিয়ে ডেঙ্গুর থাবা

সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬ ৩:০৮ 👁️ ১২৩ views
Link Copied!

তারানা চৌধুরী : ২০১৮ সালের অক্টোবর মাস। এক শুক্রবার রাতে মামার বাসায় দাওয়াত খেয়ে বাড়ি ফেরেন মুনিয়া (ছদ্মনাম)। তখনো সব স্বাভাবিক। কিন্তু পরদিন সকাল থেকেই হঠাৎ প্রচণ্ড জ্বর আর মাথাব্যথা শুরু হয়। বুঝতে দেরি হয় তার—ডেঙ্গু। কারণ এর আগেও দুইবার তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন, আর এবারও উপসর্গ একই—জ্বর ও মাথাব্যথা। সেদিনই বাসায় ল্যাব টেকনিশিয়ান ডেকে ব্লাড টেস্ট করান তিনি, আর রিপোর্টে যথারীতি ধরা পড়ে ডেঙ্গু পজিটিভ। NS1 antigen টেস্টে প্রথম দিনেই রোগ শনাক্ত হয়ে যায়।

শনিবার রাতে জ্বর কিছুতেই ১০৪° ডিগ্রির নিচে নামছিল না। পরদিন সকালেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে। তৃতীয়বার ডেঙ্গু হওয়ায় ডাক্তারের ভাষ্যে ঝুঁকিও ছিল অনেক বেশি। তখন কিছুই খেতে পারছিলেন না তিনি, অথচ শরীরে দরকার প্রচুর ফ্লুইড—তাই দেওয়া হয় স্যালাইন। ডেঙ্গুতে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যায় না বলে নিয়মিত সিবিসি টেস্ট করে দেখতে হয়, রক্তের প্লাটিলেট ও অন্যান্য উপাদান বাড়ছে না কমছে।

তবে প্রথম দুইবারের অভিজ্ঞতা এমন সহজ ছিল না। প্রথমবার ডাক্তার দেখানোর পর ব্লাড ও ইউরিন টেস্ট দেওয়া হয়েছিল। নর্মাল ব্লাড টেস্টে ডেঙ্গু ধরা পড়ে না, আর ইউরিন টেস্টে RBC Numerous আসায় ডাক্তার সেটিকে ইউরিন ইনফেকশন ভেবে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দেন। আল্লাহর কৃপায় সেই যাত্রায় রক্ষা পান তিনি। কিন্তু পনেরো দিন পরও দুর্বলতা না কাটায় আবার ডাক্তারের কাছে যান, এবার ডেঙ্গু টেস্ট করানো হয়—রিপোর্টে ধরা পড়ে, ডেঙ্গু হয়ে সেরেও গিয়েছে। বোঝা যায়, সেই RBC আসলে ডেঙ্গুরই ফল ছিল, ইউরিন ইনফেকশন নয়। প্রথমবারও একইভাবে জ্বর সেরে যাওয়ার পর দুর্বলতা না কাটায় টেস্টে ধরা পড়েছিল—ডেঙ্গু হয়ে সেরে গেছে।

আরও পড়ুনঃ  বাগমারায় পূজোর প্রস্তুতি সম্পন্ন, ৮৬ মন্দিরে হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব

একসময় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা যেত মূলত বর্ষাকালে। কিন্তু সে হিসাব এখন পাল্টেছে। বর্ষা পেরিয়ে গেলেও সংক্রমণ কমছে না। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যে, জলবায়ু পরিবর্তন আর কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই শরৎ কিংবা হেমন্তেও এখন ডেঙ্গু চোখ রাঙাচ্ছে। বছরের প্রথম নয় মাস শেষ না হতেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজারের বেশি। মৃত রোগীদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা প্রায় ৯ শতাংশ, যা শিশুদের নিয়ে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে আসে। শিশুর জ্বর হলে এখন শুধু পাড়ার দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাওয়ালে নিশ্চিন্ত থাকা যায় না—জ্বর দেখলেই প্রয়োজন ডাক্তারের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় টেস্ট। কারণ ডেঙ্গুতে আসল জটিলতা তৈরি হয় জ্বর কমে যাওয়ার পরই, যখন শুরু হয় প্লাজমা লিকেজ। ফুসফুসের চারপাশ ও পেটের ভেতরে প্লাজমা জমে রক্তচাপ কমে যায়; পরিস্থিতি খারাপ হলে রোগী শকে চলে যেতে পারেন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যায়, প্লাটিলেট কমে যায়, শুরু হয় রক্তক্ষরণ। এই ক্রিটিক্যাল অবস্থা সামলাতে না পেরে অনেকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তাই জ্বর হলেই অবহেলা না করে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

মুনিয়ার অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ডেঙ্গুর প্রচলিত উপসর্গের প্রায় কোনোটিই তার মধ্যে স্পষ্ট ছিল না। প্রথমবার জ্বর ছিল মাত্র ৯৯° ফারেনহাইট, তাই ডাক্তার ইউরিনের রিপোর্ট দেখেই অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দিয়েছিলেন—উপসর্গ দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে এটি ডেঙ্গু। দ্বিতীয়বারও শুধু জ্বর ছাড়া আর কোনো লক্ষণ ছিল না। তবু ডেঙ্গুর কিছু পরিচিত সাধারণ লক্ষণ রয়েছে—হঠাৎ ১০২° থেকে ১০৪° ফারেনহাইট পর্যন্ত প্রচণ্ড জ্বর ওঠা, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে তীব্র ব্যথা ও হাড়-পেশি-জয়েন্টে ব্যথা, চামড়ায় লালচে বা হামের মতো র‍্যাশ, বমিভাব ও ক্ষুধামন্দা, এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা। জ্বর কমার পর বা রোগ জটিল আকার নিলে এর চেয়েও বিপজ্জনক কিছু সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যেমন পেটে তীব্র ব্যথা বা স্পর্শকাতরতা, বারবার বমি বা বমিতে রক্ত যাওয়া, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত, প্রস্রাব বা মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, এবং অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা বা নিস্তেজ হয়ে পড়া—এসব দেখা দিলে তা জরুরি অবস্থার ইঙ্গিত।

আরও পড়ুনঃ  বর্তমান সরকার পরামর্শ গ্রহণের জন্য উন্মুক্ত : স্থানীয় সরকার মন্ত্রী

বাংলাদেশে প্রতিবছরই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় বলে জ্বর হলে সামান্য কষ্ট বা খরচ হলেও টেস্ট করিয়ে নেওয়াই ভালো। সাধারণত NS1 antigen, IgG ও IgM টেস্টের মাধ্যমে ডেঙ্গু শনাক্ত করা হয়। মনে রাখা জরুরি, ডেঙ্গুর উপসর্গ সব সময় স্পষ্টভাবে প্রকাশ নাও পেতে পারে, আর প্রকৃত বিপদ আসে জ্বরের চার থেকে ছয় দিন পর—তখনই কমতে থাকে প্লাটিলেট, শরীরে জমে পানি, এমনকি রোগী চলে যেতে পারেন কোমায়। তাই যত দ্রুত রোগ শনাক্ত হয়, তত দ্রুত রোগীকে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়। ডেঙ্গু হলে রোগীর সম্পূর্ণ বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হয়, প্রচুর পরিমাণে তরল—ডাবের পানি, ফলের জুস, ওরস্যালাইন ইত্যাদি—পান করাতে হয়, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ দেওয়া যায় না এবং সাধারণত প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কিছু দেওয়াও হয় না, আর রোগীকে মশারির ভেতরে রাখতে হয়, যাতে এডিস মশার কামড়ে অন্য কেউ সংক্রমিত না হয়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে জরুরি বিষয় সচেতনতা। এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পানিতে জন্মায়, তাই খেয়াল রাখতে হবে কোথাও পানি জমে আছে কি না—টবের গাছে বা এসির পাইপে। নিজের বাসা ও চারপাশ পরিষ্কার রাখা, কর্মস্থলেও একই সচেতনতা বজায় রাখা, সন্ধ্যার আগে জানালা বন্ধ করে দেওয়া, প্রয়োজনে দরজার বাইরে কয়েল ব্যবহার করা—এসব ছোট পদক্ষেপই এডিস মশা থেকে নিজেকে ও অন্যদের রক্ষা করতে পারে।

আরও পড়ুনঃ  সড়ক ও জনপথ শ্রমিক ইউনিয়নের আলোচনা ও মতবিনিময়

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারও দেশব্যাপী তিন মাসব্যাপী বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচিসহ একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রী দেশব্যাপী তিন মাসব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন, আর এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে প্রতি শনিবার চলছে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান। স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে গঠন করা হয়েছে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য আলাদা একটি মনিটরিং সেল। ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পরের মাস থেকেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাঠে নামে সরকার । মার্চ থেকেই প্রতি শনিবার বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠান বা বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন করে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করার জন্য সরকার ভ্রাম্যমাণ আদালত গঠন করেছে। আর স্কাউট, বিএনসিসি, রেড ক্রিসেন্ট ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে চালানো হচ্ছে সামাজিক আন্দোলন ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম।

হাসপাতালের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার স্থাপন করা হয়েছে এবং রোগীর অতিরিক্ত চাপ সামলাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাঠে ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে, পাশাপাশি নিশ্চিত করা হয়েছে পর্যাপ্ত স্যালাইন ও টেস্ট কিট সরবরাহ। সারা দেশে প্রায় ৩০০ চিকিৎসককে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা বিনামূল্যে করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ভর্তি করা, প্রয়োজনে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে । সংক্রমণ ঠেকাতে ডেঙ্গু রোগী এবং পার্শ্ববর্তী ওয়ার্ডের রোগীদের জন্যও মশারির ব্যবস্থা করা হয়েছে । স্যালাইন, ওষুধ এবং ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিটের কোনো ঘাটতি যেন দেখা না দেয় সেজন্য প্রয়োজনীয় সব ধরননের ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে ।

 

মৃত্যু আসবে অবধারিতভাবেই। কিন্তু একটি মশার কামড়ে আকস্মিক মৃত্যু নিশ্চয়ই কারও কাম্য নয়। সচেতন হওয়া আর সচেতনতা তৈরি করাই তাই এখন সবচেয়ে জরুরি করণীয়।

#লেখক: তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর

পিআইডি ফিচার

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল সময়ের কথা ২৪ লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন somoyerkotha24news@gmail.com ঠিকানায়।