স্টাফ রিপোর্টার : আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার রাজশাহী আসছেন তারেক রহমান। তাঁকে একনজর দেখতে সকাল থেকেই নগরীতে আসতে শুরু করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। কেউ রাতের ঘুম হারিয়েছেন প্রিয় নেতাকে দেখার আশায়, কেউ আবার তাঁর জন্য লিখেছেন গান। ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে জনসভার প্রস্তুতি শেষ। নগরীও সেজেছে নতুন সাজে। তবে এই আগমন ঘিরে শুধু উৎসব আর উচ্ছ্বাস নয়, রাজশাহীবাসীর প্রত্যাশাও অনেক। কর্মসংস্থান, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ, শিল্পায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মতো দীর্ঘদিনের দাবিগুলো এবার কতটা গুরুত্ব পাবে, সেই অপেক্ষায়ও আছেন তাঁরা।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহীর হযরত শাহ মখদুম (রহ.) বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সেখান থেকে তিনি যাবেন নগরীর ঐতিহ্যবাহী ধর্মসভা মন্দিরে। পরে রাজশাহী সার্কিট হাউসে কিছুক্ষণ অবস্থান করবেন। বিকেল ৩টায় ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠের জনসভায় যোগ দেবেন তিনি। সেখানে আখচাষিদের হাতে প্রণোদনা তুলে দেওয়ার পাশাপাশি রাজশাহীবাসীর উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনের অপেক্ষায় সকাল থেকেই সরগরম নগরী। বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মীরা আসছেন জনসভাস্থলে। কেউ মাঠে অবস্থান করছেন, কেউ আবার পথে রয়েছেন। সময় যত এগোচ্ছে, তাঁদের অপেক্ষাও যেন দীর্ঘ হচ্ছে।
মাঠে অপেক্ষমাণ বিএনপির নেত্রী নাদিরা বেগম। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে তিনি একটি গান লিখেছেন। তাঁর ইচ্ছা, সুযোগ পেলে গানটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে শোনাবেন।
নাদিরা বেগম বললেন, ‘রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রী আসবেন, এ জন্য আমি তাঁকে নিয়ে গান তৈরি করেছি। আমার ইচ্ছা, প্রিয় প্রধানমন্ত্রীকে গানটি শোনাব। কখন আসবেন, কখন তাঁকে সরাসরি দেখতে পাব—এই অপেক্ষায় মন ব্যাকুল হয়ে আছে।’
একই রকম আগ্রহ নিয়ে জনসভাস্থলের দিকে যাচ্ছিলেন নাটোরের আব্দুল মজিদ সরকার। প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় যোগ দিতে আগের রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি তিনি। ভোরেই রওনা দিয়েছেন রাজশাহীর উদ্দেশে।
আব্দুল মজিদ সরকার বললেন, ‘জনসভায় আসব বলে রাতে ঘুমাতে পারিনি। ভোরেই নাটোর থেকে রওনা দিয়েছি। এখন জনসভাস্থলের দিকে যাচ্ছি। প্রিয় প্রধানমন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখব, এটাই আমার প্রত্যাশা।’
তবে এই অপেক্ষার পেছনে রয়েছে আরও বড় প্রত্যাশা। রাজশাহীর তরুণদের কাছে কর্মসংস্থান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি। উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলোও তাঁদের ভাবনায় রয়েছে।
আব্দুল্লাহিক কাফী নামের এক যুবক বললেন, রাজশাহীতে কর্মসংস্থানের অভাব তরুণদের জন্য বড় সমস্যা। তাঁর প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেবেন। এতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। শক্তিশালী হবে স্থানীয় অর্থনীতি।
আব্দুল্লাহ আল মামুন ওয়াসিফের প্রত্যাশা, রাজশাহীর অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী। শিক্ষানগরী হিসেবে রাজশাহীকে আরও এগিয়ে নিতে শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে নগরীকে আধুনিক, শান্তিপূর্ণ ও বসবাসযোগ্য করে গড়ে তোলার উদ্যোগ চান তিনি।
শিক্ষার্থী খালিদ বিন ওয়ালিদ আবিরের চাওয়া পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন বলে আশা তাঁর।
রাজশাহীর উন্নয়ন নিয়ে এমন প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির সুযোগ সীমিত। শিল্পায়নের গতি বাড়েনি প্রত্যাশা অনুযায়ী। ফলে কর্মসংস্থানের অভাবে অনেক তরুণকে কাজের সন্ধানে অন্য অঞ্চলে যেতে হয়। এই পরিস্থিতি বদলাতে নতুন বিনিয়োগ, শিল্পাঞ্চল ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন চান স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নগরীর প্রস্তুতিও শেষ পর্যায়ে। সড়কের বিভাজকে নতুন রং করা হয়েছে। পুরোনো স্থাপনায় দেওয়া হয়েছে রঙের প্রলেপ। পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজেও ব্যস্ত সময় পার করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা।
ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে তৈরি হয়েছে ৫৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩৫ ফুট প্রস্থের মঞ্চ। মাঠ ও আশপাশে বসানো হয়েছে শতাধিক মাইক এবং চারটি এলইডি স্ক্রিন। মঞ্চ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার বাইরে মাঠে কোনো ব্যানার, ফেস্টুন বা বিলবোর্ড রাখা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় নেওয়া হয়েছে তিন স্তরের ব্যবস্থা। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির বললেন, গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি সাদাপোশাকে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। থাকবে স্ট্যাটিক ও স্ট্রাইকিং ফোর্স। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন সেক্টরের নিরাপত্তা তদারক করবেন। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন।
তিনি জানান, বিমানবন্দর থেকে সার্কিট হাউস পর্যন্ত সড়কে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যেসব সড়ক দিয়ে চলাচল করবেন এবং যেসব স্থানে অবস্থান করবেন, সেখানেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ তৈরি হয়েছে। রাজশাহীর সঙ্গে তারেক রহমানের আবেগের সম্পর্ক রয়েছে। এই মাঠেই তিনি নির্বাচনী প্রচারের শেষ বক্তব্য দিয়েছিলেন। এবার সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর আগমনকে ঘিরে নগরবাসীর প্রত্যাশাও অনেক।
রাজশাহীর উন্নয়ন প্রসঙ্গে রিটন বললেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ, বন্ধ রেশম কারখানা চালু এবং হাইটেক পার্ক নতুনভাবে সাজানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এসব উদ্যোগের অগ্রগতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে আরও পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তিনি রাজশাহীতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, আম সংরক্ষণের জন্য আধুনিক হিমাগার নির্মাণ এবং পদ্মার পাড়ে নতুন স্মৃতিসৌধ বা স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের দাবি জানান। তাঁর মতে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। এতে রাজশাহী মহানগর ও আশপাশের এলাকার মানুষের জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলবে।
নগরীর পরিচ্ছন্নতা, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা ও নাগরিক সেবার মান বাড়ানোর কাজ অব্যাহত রাখার কথাও জানান রিটন। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে রাজশাহীকে আরও সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চান তাঁরা।
রাজশাহীর অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু। তাঁর মতে, কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ, আখচাষিদের সহায়তা এবং কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আখচাষিদের প্রণোদনা দেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে।
মিনু বললেন, রাজশাহী বিমানবন্দরে কার্গো বিমান চালু এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা গেলে কৃষিপণ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়বে। এতে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে। পাশাপাশি রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও শিশু হাসপাতাল চালু, ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে বিরতিহীন ট্রেন চালু, কলকাতার সঙ্গে রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং চার লেনের বাইপাস সড়ক নির্মাণ এ অঞ্চলের চিকিৎসা, যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে ভূমিকা রাখতে পারে।
রাজশাহীর হারিয়ে যাওয়া চিনি ও রেশমশিল্পের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন ভূমিমন্ত্রী। তাঁর মতে, নতুন বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের জন্য সরকার, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের আরেকটি উদ্দেশ্য সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দেওয়া। মিনু বলেন, দেশের স্বার্থ সবার আগে। দল ও জনগণের কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে রাজশাহীর উন্নয়ন এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণে প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন বলে তিনি আশাবাদী।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রকাশিত সফরসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে সামরিক বিমানে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে যাবেন তারেক রহমান। সেখান থেকে রংপুরের রাধা গোবিন্দ মন্দির পরিদর্শন শেষে রাজশাহীর হযরত শাহ মখদুম (রহ.) বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে তাঁর। দুপুর দেড়টায় রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী ধর্মসভা মন্দির পরিদর্শন করবেন তিনি। এরপর সার্কিট হাউসে কিছুক্ষণ অবস্থান করে বিকেল ৩টায় ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠের জনসভায় যোগ দেবেন।
রাজশাহীর কর্মসূচি শেষে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে রহমতগঞ্জের জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে রাতে ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে তাঁর। এক দিনের সফরে তিন বিভাগের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন তিনি।
রাজশাহীবাসীর কাছে আজকের এই সফর কেবল একজন প্রধানমন্ত্রীর আগমন নয়। এটি দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশা তুলে ধরারও একটি উপলক্ষ। কর্মসংস্থান, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পদ্মা ব্যারাজ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও শিল্পায়নের মতো বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি চান তাঁরা। জনসভার মাঠে এখন অপেক্ষা প্রিয় নেতাকে একনজর দেখার। আর মাঠের বাইরে অপেক্ষা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তব রূপ দেখার।

