নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

বাংলাদেশ । । ।

বড়াইগ্রামে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১৪, আহত ২৫

অক্টোবর ২০, ২০২৬ ৭:০৪ 👁️ ৭ views
Link Copied!

বড়াইগ্রাম (নাটোর) প্রতিনিধি : নাটোরের বড়াইগ্রামে একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৪, আহত ২৫। এক যুগ আগে তথা ১২ বছর আগে ২০ অক্টোবর ২০১৪ তারিখে একই উপজেলায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ৩৮ জন।

মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বনপাড়া-পাবনা মহাসড়কের নাটোরের বড়াইগ্রামের বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে যাত্রী বাস ও বালুভর্তি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছে এবং কমপক্ষে ২৫ জন আহত হয়েছে। ২০১৪ সালের একই তারিখে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের রেজুর মোড়ে দূরপাল্লার যাত্রীবাহি কেয়া পরিবহনের সাথে লোকাল যাত্রীবাহি বাস অথৈ পরিবহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে ৩৮ জন প্রাণ হারায়। স্থানীয়রা মনে করেন মঙ্গলবারের দুর্ঘটনাটি ট্রাকের সাথে না হয়ে অপর যাত্রীবাহি বাসের সাথে ঘটলে মৃত্যুর সংখ্যা ২০১৪ সালের মতোই হতো।

জানা গেছে, বরিশালের বরগুনা থেকে পঞ্চগড়গামী আরপি পরিবহনের যাত্রীবাহী একটি বাস মঙ্গলবার ভোরে বড়াইগ্রাম এলাকায় পৌঁছালে পাবনাগামী বালু ভর্তি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে ৯ জন এবং বিভিন্ন হাসপাতালে আরও ৫ জন সহ মোট ১৪ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয়ে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছে কমপক্ষে ২৫ জন। নিহতের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানায় উদ্ধারকারী ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। নিহত মোট ১৪ জনের মধ্যে ১২ জনের পরিচয় জানিয়েছে পুলিশ। তারা হলেন, রাজশাহী গোদাগাড়ির ফরাদপুরের আব্দুল হাকিমের ছেলে সোহেল রানা (৪০), বাগমারার কনোপাড়া এলাকার বাবর আলীর ছেলে আনোয়ার হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের পূর্ব সুবিধখালীর শহিদুল ইসলামের মেয়ে তাসফিয়া (৮), শরিয়তপুরের জাজিরার রামকৃষ্ণপুরের জহিরউদ্দিন মাতব্বরের ছেলে জুয়েল মাতব্বর (৪০), জাজিরার ডুবি সাহাপুর গ্রামের ইউনুস শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার (৩০) একই গ্রামের জাহানউদ্দিন মোল্লার ছেলে শাহ্লাল মোল্লা (৪৬) ও মৃত আরব আলীর ছেলে আব্দুস সামাদ (৭০), কাথুরিয়া গ্রামের রাজ্জাক ব্যাপারীর ছেলে শাহিন ব্যাপারী (৩২), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের পূর্ব সুবিধখালীর আজাহার হাওলাদারের ছেলে শহিদুল ইসলাম (৪৫), ঝিনাইদহের সদও বড় মান্দারবাড়িয়া গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে আবুল কালাম (৫৬). নওগাঁর শাপাহার ঘোনটোলা গ্রামের সাজ্জাদ হোসেনের ছেলে রাসেল সেখ (৩৩), ফরিদপুরের সদও বাখোন্দিয়া গ্রামের অমর কুমার জমাদারের ছেলে হিমেশ কুমার জমাদার (৩৫)। বাকি ২ জনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা গেলে ময়না তদন্তে মৃতদেহ কাটা ছেঁড়া করবে এমন ভেবে সেখান থেকে তাদেরকে নিজ বাড়িতে নিযে যায় স্বজনেরা। এ সময় মৃতদের কোন পরিচয় দিতে রাজী হয়নি স্বজনেরা। তবে জানা যায়, তাদের বাড়ি রাজশাহী গোদাগাড়ি এলাকায়। নিহত ১২ জনের মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক।

আরও পড়ুনঃ  বেনাপোলে পিস্তল, গুলি ও ম্যাগাজিনসহ ভ্যান চালক আটক

স্থানীয়রা জানায়, ভোরে বিকট শব্দ পেয়ে সড়কে দৌড়ে এসে দেখি মানুষের আর্তনাদ। পরে নিজেরাই উদ্ধারের পাশাপাশি পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজনকে খবর দিলে তারা এসে নিহত ও আহতদের উদ্ধার করে আহতদের দ্রুত বিভিন্ন হাসপাতালে প্রেরণ করে। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার উদ্ধার তৎপরতার কারণে কিছু সময় নাটোর-পাবনা মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।

বনপাড়া হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন ও নাটোর ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুর রউফ বলেন, সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই নয়জনের মৃত্যু হয়। পরে মরদেহগুলো উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতাল মর্গে এবং আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিক, হাসপাতাল, নাটোর সদর হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

আরও পড়ুনঃ  বাংলাদেশের পর্যটন খাতে ১.২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা জাপানি বিনিয়োগকারীদের

খবর পেয়ে নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক, হাইওয়ে পুলিশ বগুড়া রিজিওনের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম, বড়াইগ্রামের উপজেলা নির্বাহী অফিসার লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস, অফিসার ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং আহতদের চিকিৎসার খোঁজ খবর নিয়েছেন।

আহত যাত্রী শরীফুল ইসলাম জানান, কুষ্টিয়ার লালন ফকিরের মাজারের অনুষ্ঠান শেষে আরপি পরিবহনের ওই বাসে ঠাসাঠাসি করে যাত্রী উঠে। যাত্রীদের সাথে ভাড়া নিয়ে কন্ডাক্টর এর কথাকাটাকাটি ও চিৎকার চেঁচামেচিতে চালক বিব্রত হয় এবং চালক বারবার পেছনে তাকাচ্ছিলো। পরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপরীতমুখী ট্রাকের সাথে সংঘর্ষ হয়। হাইওয়ে পুলিশ বগুড়া রিজিওনের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন জানান, আরপি পরিবহনের এই বাসটির ফিটনেস এর মেয়াদ শেষ হয়েছে ১৩ মে ২০২৬ তারিখে এবং রুট পারমিট এর মেয়াদ রয়েছে ১৩ মে ২০২৬ তারিখ। বাসটি কিভাবে সড়কে চলাচল করছিলো তা খতিয়ে দেখা হবে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত নাটোর-২ আসনের এমপি ও জাতীয় সংসদের হুইপ এ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু সাংবাদিকদের বলেন, নিহতদের পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিক জেলা প্রশাসন থেকে পরিবার প্রতি ২৫ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নিহত প্রতি পরিবারকে ১ লক্ষ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে। এছাড়া আহতরা যাতে বিনামূল্যে ও বিশেষ যত্নে চিকিৎসা সেবা পায় তার জন্য সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াতকে প্রধান করে ৭ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে অন্যরা হলেন, পুলিশ সুপার, বড়াইগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ, বিআরটিএ এর সহকারী পরিচালক ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর উপ-সহকারী পরিচালক।

আরও পড়ুনঃ  চারঘাটে দ্বন্দ্ব নিরসন ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় মতবিনিময় সভা

উল্লেখ্য, বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া বাইপাস চত্বর থেকে নাটোর অভিমুখে, ঢাকা অভিমুখে ও পাবনা অভিমুখে মোট ৪৭ কিলোমিটার হাইওয়ে সড়ক রয়েছে। যার ফলে এই উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যাও বেশী। বিভিন্ন গনমাধ্যম সুত্রের হিসেবে বিগত ২০০২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২৪ বছরে প্রায় ১১২৭ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করেছে সহস্রাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু। মূলতঃ যানবাহনের তুলনায় এই মহাসড়ক সরু। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, কৃষি নির্ভর বড়াইগ্রাম উপজেলার উদপাদিত কৃষি পণ্য আনা নেওয়ার জন্য এই সড়কে বিভিন্ন ধরণের স্থানীয় যানবাহন যেমন- তিন চাকার ভ্যান, ভুটভুটি, নসিমন, ট্রলি, অটোরিক্স্রা চলাচল করে। এ সব যানবাহনের কারণে দুর্ঘটনা পড়ে দূরপাল্লার যানবাহন। বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের ৩২ কিলোমিটারের মধ্যে ২৫টি দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁক রয়েছে। এই সড়কটি সরু। দুটি বড় যান ওভারটেক করবে তেমন উপযুক্ত স্পেস নেই। এই মহাসড়কের পাশে ফিডার সড়ক থাকলেও অতিরিক্ত বাঁক ও সরু সড়ক হওয়ায় এই মহাসড়কে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে।

অপরদিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রাম উপজেলার আহমেদপুর ভায়া বনপাড়া হয়ে রাজাপুর পর্যন্ত দীর্ঘ মহসড়কে কোন ফিডার সড়ক নাই। ফলে স্থানীয় যানবাহনগুলো, মোটরসাইকেল এমনকি বাইসাইকেলও মহাসড়কের উপর দিয়ে চলাচল করে। এই মহাসড়কে ফিডার সড়ক নির্মাণ না করলে এবং উপজেলার পুরো ৪৭ কিলোমিটার মহাসড়কের প্রস্থ না বাড়ালে দুর্ঘটনা কোনভাবেই থামবে না বা কমবে না বলে অভিমত ব্যক্ত করেন স্থানীয়রা।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল সময়ের কথা ২৪ লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন somoyerkotha24news@gmail.com ঠিকানায়।