১৯৪৫ সালে বিশ্ব যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন একটি প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল জাতিসংঘ–ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ৮১ বছর। এই সময়ে বদলেছে পৃথিবী, বেড়েছে প্রযুক্তির শক্তি, বিস্তৃত হয়েছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। কিন্তু যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি আর মানবিক বিপর্যয়ের খবর এখনো থামেনি। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে–যে বিশ্বকে নিরাপদ করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে জাতিসংঘের জন্ম, সেই বিশ্ব কি সত্যিই আগের চেয়ে নিরাপদ? নাকি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সংস্থাটির সেই প্রতিশ্রুতিই বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে?
৮১ বছর পরও কেন প্রশ্নের মুখে জাতিসংঘ?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা ছিল, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই ১৯৪৫ সালে যাত্রা শুরু করে জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো ছিল সংস্থাটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ৮১ বছর পরও বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকটের বাস্তবতা সেই প্রত্যাশার পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
প্রতি বছর ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস পালিত হয়। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্থাটির জন্ম হয়। বর্তমানে ১৯৩টি সদস্যদেশের এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বশান্তি রক্ষা থেকে শুরু করে মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। তবু আন্তর্জাতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক থামেনি।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে জাতিসংঘের সব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে সংস্থাটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে, সংকটাপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং সংঘাত মোকাবিলায় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু পরাশক্তিগুলোর বিরোধ, নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ব্যবস্থা এবং সদস্যদেশগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থ অনেক সময় কার্যকর পদক্ষেপের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে প্রশ্নটি কেবল জাতিসংঘ সফল না ব্যর্থ, তা নয়; বরং বদলে যাওয়া বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংস্থাটি কতটা সক্ষম এবং আরও কার্যকর হতে তার কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে জাতিসংঘের জন্ম
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯১৯ সালে গড়ে ওঠে লীগ অব নেশনস। কিন্তু আগ্রাসন ঠেকাতে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধে সংস্থাটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্বনেতাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয়, আন্তর্জাতিক বিরোধ মীমাংসা ও সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন।
এই উপলব্ধি থেকেই ১৯৪৫ সালে সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলনে ৫০টি দেশের প্রতিনিধিরা জাতিসংঘ সনদ প্রণয়ন করেন। ২৬ জুন সনদে স্বাক্ষর করা হয় এবং প্রয়োজনীয় অনুসমর্থন সম্পন্ন হওয়ার পর ২৪ অক্টোবর তা কার্যকর হয়। প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, দেশগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং মানবাধিকার ও উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানো।
জাতিসংঘের ছয়টি প্রধান অঙ্গের মধ্যে সাধারণ পরিষদে সব সদস্যদেশের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে; নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান দায়িত্ব পালন করে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং আইনি বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার কাজ করে। এই কাঠামোর মধ্য দিয়েই জাতিসংঘ বিশ্বসমস্যা সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগের একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ হয়ে ওঠে।
(লেখক- মো. জোহান

