স্টাফ রিপোর্টার : ২০০৯ সালে রান্নাঘরের ধোঁয়া কমাতে ৫০০ টাকায় নিজ বাড়িতে তৈরি করেন প্রথম কার্বন নিঃকরণকারী চুলা। সেটি এখন ছড়িয়ে পড়েছে রাজশাহীসহ তিন জেলার আট উপজেলায়। কার্বন নিঃসরণ কমাতে রাজশাহীর তানোরের কবুলজান বেগম মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনেকটা বিনামূল্যে প্রায় ১০ হাজার পরিবেশবান্ধব চুলা তৈরী করে দিয়েছেন। পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন কৃষিবৈচিত্র্য শেখার কেন্দ্র। সেখানে সংরক্ষণ করছেন দেশি বীজের ১৪০টি জাত। ৬২ বছর বয়সী এই নারী এখন গ্রামীণ নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, টেকসই কৃষি ও স্থানীয় জ্ঞান সংরক্ষণে কাজ করছেন।
রাজশাহীর তানোরের হরিদেবপুর গ্রামের এই নারী ২০০৮ সালে উন্নয়নকর্মীদের কাছ থেকে পরিবেশবান্ধব চুলার ধারণা পান। এরপর মাটি ও কংক্রিটের পাইপ জোগাড় করে প্রথম কার্বন নিঃস্বরণকারী চুলা তৈরী করেন। তার এই চুলা দেখে আশেপাশের লোকজন বিনামূল্যে তার থেকে চুলা তৈরী করে নিতেন। ধীরে ধীরে তার এই উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের কয়েক গ্রামে। এভাবেই ২০১৩ সাল থেকে বড় পরিসরে চুলা তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তাঁর তৈরি চুলা ছড়িয়ে পড়েছে রাজশাহীর তানোর, গোদাগাড়ী, পবা ও মোহনপুর; নওগাঁর নিয়ামতপুর, মহাদেবপুর ও মান্দা এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার প্রায় ৯৫টি গ্রামে। রাজশাহী নগরের শ্রীরামপুর ও নামোভদ্রা এলাকার বস্তিতেও চুলা তৈরি করেছেন তিনি।
এই চুলায় কাঠ, খড় ও শুকনো পাতা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বাইরে বেরিয়ে যায়। ছিদ্রযুক্ত মাটির ঢাকনি ধোঁয়ার ক্ষতিকর কণা কমাতে সহায়তা করে। তবে চিমনি ও ঢাকনি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হয়। এতে জ্বালানি কম লাগে। রান্নাঘরে ধোঁয়া ও কালি জমে কম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে এখনো প্রায় ২৬০ কোটি মানুষ কাঠ, কয়লা ও ফসলের অবশিষ্টাংশের মতো কঠিন জ্বালানি পুড়িয়ে রান্না করেন। এসব জ্বালানি থেকে নির্গত ধোঁয়া গৃহস্থালি বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। ঝঃধঃব ড়ভ এষড়নধষ অরৎ ২০২৫ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এ ধরনের বায়ুদূষণের সঙ্গে বিশ্বে প্রায় ২৮ লাখ মানুষের মৃত্যুর সম্পর্ক ছিল। এই দূষণ হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, নিউমোনিয়া ও দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। আর কবুলজানের পরিবেশবান্ধব চুলা এসব রোগ ও মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করছে।
এমন উদ্যোগ নিয়ে কবুলজানের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়। বললেন, ‘২০০৮ সালে উন্নয়নকর্মীদের থেকে কার্বন নিঃসরণ কমাতে পরিবেশবান্ধব চুলা তৈরীর প্রশিক্ষণ পাই। শুরুতে নিজের জন্য প্রথম চুলা তৈরী করেছি ২০০৯ সালে। এরপর আশপাশের প্রায় ২৫০টি বাড়িতে পায়ে হেঁটে গিয়ে বিনামূল্যে চুলা তৈরি করে দিয়েছি। পরবর্তীতে রাজশাহী জেলা ছাড়াও নওগাঁ ও চাঁপাইনবাগঞ্জে গিয়েও এই চুলা তৈরী করছি। মৃত্যু পর্যন্ত এটি করে যাবো। এখন পর্যন্ত আমার তৈরী করা প্রায় ১০ হাজার চুলার অর্ধেকেরও বেশি বিনামূল্য করে দিয়েছি। তবে অনেক সময় কেউ খুশি হয়ে কেউ ৫০-১০০ টাকা যাতায়াত ভাড়া দিলে সেটি নিতাম। কারণ আমার উদ্দেশ্য- পরিবেশবান্ধব চুলার বিপ্লব ঘটিয়ে সাধ্যমত কার্বন নিঃস্বরণ কমানো।’ তার এমন উদ্যোগ স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়নকর্মীদের নজরে আসার পর বিভিন্ন উদ্ভাবনী মেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান তিনি। পরে যুক্ত হন উন্নয়ন সংস্থা বারসিকের সঙ্গে।
উন্নয়ন সংস্থা বারসিকের রাজশাহী আঞ্চলিক সমন্বয়ক মো. শহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘তাঁর তৈরি চুলা সহজ, সাশ্রয়ী এবং রান্নাঘরকে স্বাস্থ্যকর রাখতে সহায়ক। চুলা তৈরির পাশাপাশি তিনি কৃষিবৈচিত্র্য রক্ষায়ও কাজ করছেন।’
কবুলজানের স্বামী মোবারক হোসেন বললেন, ‘চুলাটি এত সহজ যে কবুলজান বাড়িতে না থাকলেও আমি এটি ব্যবহার করতে পারি।’প্রতিবেশী বাণী রাণী সূত্রধর বললেন, ‘তার তৈরী চুলা থেকে ঘরের ভেতরের ধোঁয়া থেকে মুক্তির উপায় পেয়ে আমরা সত্যিই খুশি।’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চুলা তৈরীর পাশাপাশি তার বাড়ির শেখার কেন্দ্রে রয়েছে ফুল, ফল, সবজি, ঔষধি ও বুনো গাছের ১২১টি প্রজাতি। সংরক্ষণ করছেন দেশি বীজের ১৪০টি জাত। বসতভিটা ও কৃষিজমিতে চাষ করেন। পালন করেন গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস ও মুরগি। এছাড়া ২০১৫ সালে প্রায় ২০০ নারীকে নিয়ে গড়ে তোলেন হরিদেবপুর নারী সংগঠন। তাঁর কেন্দ্রে রয়েছে পুরোনো ঢেঁকি। কৃষক ও লোকজ চিকিৎসকেরা বাগান থেকে ঔষধি গাছ সংগ্রহ করেন।
১৯৭৮ সালে ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয় কবুলজানের। পড়াশোনা প্রাথমিক পর্যন্ত। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৬ সালে পেয়েছেন জয়িতা পুরস্কার। গত ১৫ অক্টোবর গ্রামীণ নারী দিবসেও পেয়েছেন বিশেষ সম্মাননা।

