শিক্ষা হলো আলোর মশাল। আলো যেমন অন্ধকার দূর করে চারপাশকে আলোকিত করে, শিক্ষা তেমনি মনের অজ্ঞতা ও অন্ধকার বিদূরিত করে আলোকিত মানুষ তৈরি করে। শিক্ষা মানুষের সকল কুসংস্কার ও সংকীর্ণতা দূর করে জ্বালিয়ে দেয় জ্ঞান ও বিবেকের দ্বীপশিখা। অন্ধকারের বুক চিরে একটি মশালের মতো মানুষের সামনে জ্ঞানের আলোকিত পথ যিনি উন্মুক্ত করেন তিনিই ‘শিক্ষক’। শিক্ষক হলেন জ্ঞানের আলো ছড়ানোর কারিগর।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকের ওপর। একজন শিক্ষক শুধু শিক্ষকই নন, তিনি হলেন সমাজের দর্পণ। তাঁর হাতে জ্বলে ওঠা জ্ঞানের মশাল শুধু শ্রেণিকক্ষে নয়, তা আলোকিত করে পরিবার, সমাজ ও সমগ্র দেশকে। জাতি হয় সমৃদ্ধ। তৈরি হয় সুনাগরিক। একজন শিক্ষকের প্রভাব শিক্ষার্থীর সারা জীবনকে অনুরণিত করে। সুশিক্ষকের প্রভাব এতোই গভীরে, যা কখনো শেষ হয় না।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘তরুলতা সহজেই তরুলতা, পশুপাখি সহজেই পশুপাখি, কিন্তু মানুষ প্রানপণ চেষ্টায় মানুষ’। অর্থাৎ পশুপাখিকে পশুপাখি হওয়ার জন্য কোনো চেষ্টা বা সাধনা করতে হয় না; মানুষকে মানুষ হতে হয় শত চেষ্টায়, শত সাধনায়। এজন্য মানুষকে দ্বিজ বলা হয়। কারণ মানুষকে শারীরিকভাবে একবার জন্মগ্রহণ করার পর আবার শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে মানুষের প্রকৃত রূপ ধারণ করতে হয়। মানুষকে মানুষ তৈরির এ জটিল কাজটিই করে থাকেন ‘শিক্ষক’। তাইতো শিক্ষকের এতো মর্যাদা।
শিক্ষায় উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে আলোকপাত করলে তা সহজেই অনুমেয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় রোল মডেল খ্যাত ফিনল্যান্ডে শিক্ষকরা সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। দেশের সবচেয়ে মেধাবীদের নেওয়া হয় শিক্ষকতা ও শিক্ষাব্যবস্থাপনায়। সে সমাজে শিক্ষকের সম্মান, মর্যাদা ও অবস্থান সবার ওপরে। এশিয়ার প্রতিনিধিত্বকারী সিঙ্গাপুরের দিকে দৃষ্টিপাত করলেও একই চিত্র পাওয়া যাবে। অথচ আমাদের অবস্থা?
অপ্রিয় হলেও সত্য, শিক্ষকের সেই মর্যাদা ও সম্মানের স্থানটুকু আমরা আজও নিশ্চিত করতে পারিনি। পারিনি বলেই আলোর মশালটি যথাযথ বিকশিত হতে পারছে না; পারছে না সমাজকে আলোকিত করতে। জাতি হিসেবে এটা খুবই লজ্জার। শিক্ষকতায় আমরা মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে পারিনি। শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধাসহ সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারিনি।
সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বৈষম্য এখনো সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা মানানসই হলেও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারি নিয়োগ থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে অনিয়মে ভরা। প্রতিষ্ঠানগুলোর ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্ণিং বডিকে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োজনীয়তা এবং কর্মপরিধি নিয়ে অনেকের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে ‘সবেধন মণি’ খ্যাত এনটিআরসিএ’র অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। আইনি জটিলতা থাকলে তা যথাসম্ভব দূর করে এ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও গতিশীলতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। একইসঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রশাসনের শত শত শূন্য পদ পূরণ করাও জরুরি।
অপ্রতুল সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় সবেচেয়ে বেশি। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের ১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে সরকারি ৬৫ হাজার ৫৬৭; মাধ্যমিকে ২০ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ের মধ্যে সরকারি ৭০২; উচ্চ শিক্ষায় ১৭৮ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সরকারি ৬১ বাকিগুলো সবই বেসরকারি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ কোটি ১ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে ১ কোটি ৬ লাখের একটু বেশি এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৭৮ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে ৪ লাখ ৬৮ হাজারের একটু বেশি, যা মাত্র ৬% (প্র.আ. ১৭/৯/২৬ খ্রি.)।
পরিসংখ্যানে স্পষ্ট প্রতীয়মান, এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশেই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। বেসরকারিভাবে এতো অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী যাদের হাতে ন্যস্ত, তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া ও মান নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিবিড় সুপারভিশনের অবস্থা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ মনিটরিং ব্যবস্থা উন্নত না হলে কোনো সিস্টেমের পক্ষেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। সার্বিক বিষয়গুলো নিয়ে যথেষ্ট গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
ভাগ্য মেনে নিয়ে আর কতদিন চলা যায়! শিক্ষা নিয়ে আমাদের অবহেলার অবসান হওয়া প্রয়োজন। মানসম্মত শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রশ্নে আমাদের আপসহীন হতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে। এ দেশে দেখা যায়, থানা পুলিশ, কৃষক, মৎসজীবি ও খামারিদের পরিচালনার জন্য বিসিএস ক্যাডারের মেধাবি জনবলের প্রয়োজন পড়ে। অথচ শিক্ষার বেলায় কোনো মতে ভারপ্রাপ্ত, অতিরিক্ত দায়িত্ব, চলতি দায়িত্ব, প্রকল্প বা আউট সোর্সিং একটা হলেই হয়! শিক্ষা নিয়ে ইতিবাচক ভাবনার বোধদয় এ জাতির আর কবে হবে?
বাস্তবতায় দেখা যায়, কোনো পেশায় ঠাঁই না পেয়ে বাধ্য হয়েই শেষ ভরসা শিক্ষকতা অথবা শিক্ষা কর্মকর্তা। অনেকটা নতি স্বীকার করে ভাগ্য মেনেই শুরু হয় এ যাত্রা। ফলশ্রুতিতে ফলাফল যেন, ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’! শিক্ষকদের নিয়ে অনেক প্রত্যাশা থাকতে পারে। থাকতে পারে কিছু সমালোচনা ও অসন্তুষ্টিও। কিছু শিক্ষকের অনৈতিক ও আর্থিক অনিয়মে হতাশাও থাকতে পারে। কিন্তু এ দায় কি শুধু শিক্ষকের একার?
কাজী কাদের নেওয়াজ ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতায় অসাধারণ এক অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন, ‘শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার, দিল্লির পতি সে তো কোন ছার’। সমাজের সবচেয়ে বিনয়ী, শুভ্র, তেজোদীপ্ত ও ধীশক্তি সম্পন্ন মানুষটিই হলেন শিক্ষক। বাহ্যিকভাবে তিনি নরম ও শান্ত প্রকৃতির হলেও ভেতরে এক সীমাহীন শক্তির আধার। যে শক্তিকে স্পর্শ করা যায় না, কল্পনা করা যায় না। এ যেন মনের গহিনে তিলে তিলে জমানো মনুষ্যত্বের এক দুর্ভেদ্য ইমারত। বাইরের কোনো শক্তি তাকে অতিক্রম করতে পারে না।
শিক্ষকের সেই শক্তি যেন আজ মলিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষকের হারানো সেই শক্তিকে ফিরিয়ে আনতে হবে। আলোর মশালটিকে পরিপূর্ণ প্রজ্বলনের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। আলো সোজা পথে চলে; বাধায় আলো চলতে পারে না। আলোর মশালের সেই সোজা পথ আমাদেরই তৈরি করে দিতে হবে। এ পথ যত মসৃণ হবে সমাজ তত সুশৃঙ্খল হবে, জাতি হবে আলোকিত। শিক্ষকের মর্যাদার সঙ্গে রাষ্ট্র তথা জাতির ভবিষ্যৎ জড়িত। তাই শিক্ষকের প্রতি অবহেলা রাষ্ট্রের প্রতি অবহেলারই সামিল। জাতির মুক্তির জন্য শিক্ষকের সম্মান ও শ্রদ্ধার জায়গাটুকু সমৃদ্ধ করতে হবে। চেতনায় ঠাঁই দিতে হবে, ‘শিক্ষকের জন্য সবাই অপেক্ষা করবে, শিক্ষক কারও জন্য অপেক্ষা করতে পারে না।’
সহায়ক গ্রন্থ:
০১। নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
০২। শিক্ষার সংযোগ, ড. মুহাম্মদ আব্দুল মুমীত
ড. মুহাম্মদ আব্দুল মুমীত, ইউএএস
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস
বাগমারা, রাজশাহী।

