স্টাফ রিপোর্টার : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছিল। ছবিটি দেখে মন্তব্য করেন রাজশাহীর এক কলেজছাত্র। লেখেন, ‘ইস! একটা বড় সুযোগ ছিল, শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল।’ মন্তব্যটি ঘিরে শুরু হয় আলোচনা। পরদিন বুধবার অভিযান চালিয়ে ওই তরুণকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরে তাঁর বাবাকেও হেফাজতে নেওয়া হয়। বর্তমানে বাবা-ছেলে দুজনই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে রয়েছেন।
আটক তরুণের নাম আবু বকর সিদ্দিক (২২)। তিনি রাজশাহী নগরের চন্দ্রিমা থানার কেচুয়াতৈল এলাকার বাসিন্দা। তাঁর বাবা আয়নাল হক পেশায় কৃষক। আবু বকর রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
বুধবার বিকেলে অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এসআরবি-৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়সাল ইশতিয়াক। তিনি বলেন, ‘আমরা দুজনকেই ডিবির কাছে হস্তান্তর করেছি। এ বিষয়ে বিস্তারিত তারা (ডিবি) পরে জানাবে।’
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পড়াশোনার পাশাপাশি ভ্যানে সবজি পরিবহনের কাজ করেন আবু বকর। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। এলাকায় তিনি ভালো ছেলে হিসেবে পরিচিত বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বাইকারদের একটি দলের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। দলটির সদস্যদের সঙ্গে মোটরসাইকেলে দূরদূরান্তে ঘুরতে যান তিনি। আবু বকরের মা আসমাউল হুসনা দাবি করেন, তাঁর ছেলে নিরীহ, পরিশ্রমী ও মেধাবী। তাঁকে এ ঘটনায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, চার ভাইবোনের মধ্যে আবু বকর সবার বড়। তাঁর আটকের ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় আলোচনা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার দুপুর ২টার দিকে রাজশাহী মহানগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও চন্দ্রিমা থানা-পুলিশের একটি দল আবু বকরের বাড়িতে যায়। তবে তাঁকে সেখানে পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা তাঁর অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানাতে চাননি।
পরে বিকেল ৪টার দিকে এসআরবি-৫-এর একটি দল সাদাপোশাকে ওই বাড়িতে অভিযান চালায়। আবু বকরকে না পেয়ে তাঁর বাবা আয়নাল হককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে আয়নাল হক জানান, তাঁর ছেলে জেলার পবা উপজেলার হাটরামচন্দ্রপুর ঘোলহারিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে আত্মগোপন করে আছেন।
এরপর এসআরবি সদস্যরা আয়নাল হককে সঙ্গে নিয়ে ওই বাড়িতে যান। সেখান থেকে আবু বকরকে আটক করা হয়। অভিযানে বাবা-ছেলেকে হেফাজতে নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। পরে তাঁদের ডিএমপির ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে আবু বকরের বাড়িতে তল্লাশি চালায় চন্দ্রিমা থানা-পুলিশ। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রায় এক ঘণ্টা তল্লাশি চালানো হয়। তবে জব্দ করার মতো কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। শুধু একটি পেনড্রাইভের মোড়ক জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশ আবু বকরের ব্যবহৃত একটি ল্যাপটপ উদ্ধারের চেষ্টা করেছে। তবে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, আবু বকর ল্যাপটপ ব্যবহার করতেন না। তাঁর কোনো ল্যাপটপও নেই।
আবু বকরের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও নানা বক্তব্য পাওয়া গেছে। রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, আবু বকর কলেজের নিয়মিত শিক্ষার্থী। তিনি প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়েছেন। তবে ফল প্রকাশিত হয়নি। কলেজে তাঁর মধ্যে খারাপ কিছু দেখেননি বলে জানান এই শিক্ষক।
চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম জানান, আবু বকর আগে কখনো গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর নামে কোনো মামলা আছে কি না, সে তথ্যও পাওয়া যায়নি। তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সম্পর্কেও পুলিশের কাছে কোনো তথ্য নেই বলে জানান তিনি।
আবু বকরের ফেসবুক মন্তব্যের সূত্রপাত গত মঙ্গলবার। সেদিন রাজশাহী সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিমানবন্দর থেকে মাদ্রাসা ময়দানে যান। সেখান থেকে ধর্মসভায় অংশ নিয়ে আবার বিমানবন্দরে ফেরেন। যাতায়াতের সময় তিনি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) একটি বাস ব্যবহার করেন। এ সময় সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে অসংখ্য মানুষ তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও তাঁদের শুভেচ্ছায় সাড়া দেন।
পরে ‘দ্য বিউটি অব রাজশাহী’ নামের একটি ফেসবুক পেজে বাসে বসে থাকা প্রধানমন্ত্রীর ছবি প্রকাশ করা হয়। ওই পোস্টের মন্তব্যের ঘরে আবু বকর সিদ্দিক নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে লেখা হয়, ‘ইস! একটা বড় সুযোগ ছিল শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল।’
ওই মন্তব্যের পরদিনই তাঁকে আটক করা হয়। তাঁর বাবাকেও হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে দুজনকে ঢাকায় নিয়ে ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো মামলার তথ্য বা আটকের পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

