স্টাফ রিপোর্টার : ২০১৯ সালে নিজের স্বর্ণালংকার বিক্রি করে শুরু করেছিলেন পথচলা। লক্ষ্য ছিল নিজের সম্প্রদায়ের অভাবী নারীদের হাতে কাজ তুলে দেওয়া, তাঁদের স্বাবলম্বী করা এবং সন্তানদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা। সেই ছোট উদ্যোগ এখন রাজশাহী নগরীর কয়েরদারা খ্রিস্টানপাড়া আদিবাসী পল্লীর প্রায় ১৯২ নারীর কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেছে। তাঁদের হাতে তৈরি নকশিকাঁথা বিক্রির অর্থে সুমি মুর্মু নিজ খরচে রাজশাহীর পবা উপজেলার ভূগরইল ও সন্তোষপুরে চালাচ্ছেন ‘শিশু প্রভাত বিদ্যা নিকেতন’ নামে দুটি বিদ্যালয়। সেখানে বিনা খরচে পড়ছে ১২৭ শিশু।
সম্প্রতি কয়েরদারা খ্রিস্টানপাড়ায় সুমি মুর্মুর বাসার একটি বড় কক্ষে দেখা যায়, সুই-সুতার ব্যস্ততা। কেউ কাপড় প্রস্তুত করছেন, কেউ নকশা আঁকছেন, কেউ সুতা তৈরি করছেন। কেউ আবার নকশিকাঁথায় ফুটিয়ে তুলছেন নানা নকশা। একসময় এসব নারীর অনেকেই ছিলেন দিনমজুর। অন্যের জমিতে কাজ করেই চলত তাঁদের সংসার।
এই বাস্তবতা কাছ থেকে দেখেছেন সুমি। ২০০৬ সালে এসএসসি, ২০০৮ সালে এইচএসসি পাসের পর রাজশাহী কলেজ থেকে মাস্টার্স করেন তিনি। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ থেকে বিএড সম্পন্ন করেন। একটি বেসরকারি ব্যাংকেও চাকরি করেন। কিন্তু চাকরির পাশাপাশি নিজের সম্প্রদায়ের নারীদের জীবন তাঁকে ভাবাত। তাঁদের কাছে শুনতেন অভাব, স্বামীর নির্যাতন ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে না পারার কথা।
সুমি বলেছেন, ‘আমরাই যদি না এগিয়ে আসি, তাহলে আমাদের মানুষগুলো এভাবেই পিছিয়ে পড়ে যাবে। তিনি দেখলেন, এলাকার অধিকাংশ নারী কমবেশি সেলাই জানেন। সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে কয়েকজন নারীকে দিয়ে নকশিকাঁথা তৈরি শুরু করেন। নিজেই দোকান ও শোরুমে গিয়ে নকশা দেখিয়ে অর্ডার সংগ্রহ করেন। পাঁচ-দশ পিস করে অর্ডার বাড়তে থাকে। বাড়ে নারীর সংখ্যাও। এখন প্রায় ১৯২ নারী এ কাজে যুক্ত।
কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। কেউ কাপড় প্রস্তুত করেন, কেউ নকশা বা ছাপ দেন, কেউ সুতা তৈরি করেন। কয়েকজন মিলে কাঁথা সেলাই করেন। পরে লেস লাগানো ও মেশিনে ফিনিশিং হয়। সাধারণ কাঁথায় ১৫ থেকে ১৮ দিন এবং ভারী নকশায় ২৫ থেকে ৩০ দিন সময় লাগে। কখনো এক মাসেরও বেশি। কাজের ধরন অনুযায়ী পারিশ্রমিক পান নারীরা। ভারী নকশার কাঁথায় দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়।
সুমির বাসার একটি নকশিকাঁথা সেলাই করছিলেন এলিজাবেথ হাসদা। তিনি বললেন, ‘সেলাই করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চলছে। সংসারে একটু ভালো খাচ্ছি।’মাসে প্রায় তিন হাজার টাকা আয় করেন তিনি। মেরিনা সরেন বললেন, আগে কোনো কাজ করতেন না। এখন সেলাই করে আয় করছেন। তাঁর ভাষায়, ‘মহিলারা সেলাই করি। আমাদের ভালো চলে। দুই-এক টাকা ইনকাম হয়। ভালো আছি।’
শিউলী বাসকীও আগে কোনো কাজ করতেন না। এখন সেলাইয়ের আয় দিয়ে সংসারে সহায়তার পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনায় খরচ করতে পারছেন। পেরেনতিনা হেমব্রম বলেন, আগে নিজের হাতে টাকা না থাকায় সংসারে কষ্ট হতো। এখন কাজ করে আয় করছেন, সন্তানদের পড়াশোনায়ও খরচ করতে পারছেন।
নারীদের কাজ দেওয়ার পর সুমি ভাবেন তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও। পবার ভূগরইল ও সন্তোষপুরে একটি বেসরকারি উদ্যোগের স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে শিশুদের পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তখন নিজের উদ্যোগে দুটি স্কুলের দায়িত্ব নেন তিনি। নিজের চার্চের খালি ঘরকে স্কুলে রূপ দেন। বেঞ্চ, বই, খাতা ও কলমের ব্যবস্থা করেন বিনা মূল্যে।
ভূগরইলের ‘শিশু প্রভাত বিদ্যা নিকেতনে ৭২ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক ও একজন আয়া রয়েছেন। সন্তোষপুরে রয়েছে ৫৫ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক ও একজন আয়া। দুই স্কুলেই কোনো বেতন নেওয়া হয় না। আদিবাসী শিশুদের পাশাপাশি হিন্দু ও মুসলিম পরিবারের শিশুরাও সেখানে পড়ছে।
দুটি স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য ব্যয়ের বড় অংশ আসে নকশিকাঁথা বিক্রির অর্থ থেকে। নিয়মিত বড় কোনো তহবিল বা অনুদান ছাড়াই চলছে উদ্যোগটি। অর্থের সংকটে একসময় নিজের স্বর্ণালংকারও বিক্রি করেছেন সুমি।
নকশিকাঁথার পাশাপাশি নারীদের সবজির চারা, হাঁস-মুরগি ও ছাগলও দিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি ১০ জন নারীকে ১০টি ছাগল এবং ৫০ জনকে হাঁস-মুরগি পালনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষের জন্যও দেওয়া হয়েছে চারা।
আদিবাসী নারীদের নিয়ে গড়ে তোলা ‘নারী ও শিশু কল্যাণ সংস্থা’র মাধ্যমেও চলছে বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম। সদস্যরা পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, শিশুর নিরাপত্তা ও নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতন করেন।
সুমির কাছে এই কাজ দয়া নয়; নিজের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। তিনি বললেন, ‘আমি যদি নারী আর শিশুদের জন্য কিছু করতে পারি, তাহলে মনে হয় তারা একটু হলেও ভালো থাকতে পারবে।’

