স্টাফ রিপোর্টার : জুমার নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার কথা ছিল। যাওয়ার পথে সাহেববাজার থেকে মিষ্টি কেনার পরিকল্পনাও ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এসএম রিজনের। কিন্তু বাড়ি ফেরা হয়নি তাঁর। মিষ্টি নিয়ে স্বজনদের কাছে যাওয়ার বদলে এখন তাঁকে থাকতে হচ্ছে কারাগারে। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় রিকশাচালকের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় জেলহাজতে রয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এই শিক্ষার্থী।
গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জুমার নামাজ পড়েন রিজন। এরপর নিজের প্রাইভেট কার নিয়ে সাহেববাজারের উদ্দেশে রওনা হন। পথে নগরীর তালাইমারী শহীদ মিনার এলাকায় ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। বিপরীত দিক থেকে রং সাইট দিয়ে আসা একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে যাত্রীবাহী অটোরিকশার সংঘর্ষ হয়। এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অটোরিকশাটি রিজনের চলন্ত প্রাইভেট কারের সামনে চলে আসে। মুহূর্তেই দুমড়েমুচড়ে যায় অটোরিকশাটি। প্রাণ হারান চালক।
দুর্ঘটনার পাশের একটি ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ১৬ সেকেন্ডের ফুটেজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। ফুটেজে দেখা যায়, চার লেনের সড়কে একটি মোটরসাইকেল রং সাইট দিয়ে চলছিল। এ সময় অটোরিকশাটি ইউটার্ন নিচ্ছিল। মোটরসাইকেলটি অটোরিকশাকে সামনে থেকে ধাক্কা দেয়। এরপর নিয়ন্ত্রণ হারানো অটোরিকশাটি গিয়ে পড়ে রিজনের প্রাইভেট কারের সামনে। সংঘর্ষে অটোরিকশার চালক ও যাত্রীরা ছিটকে সড়কের পাশে পড়ে যান। ক্ষতিগ্রস্ত হয় রিজনের গাড়িও।
আহত রিকশাচালককে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। একজন মানুষের মৃত্যু নিঃসন্দেহে মর্মান্তিক। তাঁর পরিবারের এই ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং কে কতটা দায়ী, তা-ও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে প্রত্যক্ষদর্শীরা।
রনি নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, রং সাইট দিয়ে আসা মোটরসাইকেলটি ইউটার্ন নেওয়া অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয়। এরপর নিয়ন্ত্রণ হারানো অটোরিকশাটি চোখের পলকে প্রাইভেট কারের সামনে চলে আসে। তাঁর মতে, দুর্ঘটনার প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিকে শনাক্ত করা প্রয়োজন।
দুর্ঘটনার পর মোটরসাইকেলচালক ঘটনাস্থল থেকে চলে যান বলে জানা গেছে। মোটরসাইকেলটি জব্দ করে নগরীর বোয়ালিয়া থানায় নেওয়া হয়। কিন্তু নিহত রিকশাচালকের ছেলে সাগর ওই রাতেই রিজনকে একমাত্র আসামি করে মামলা করেন। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৯৮/১০৫ ধারায় করা মামলায় রিজন এখন কারাগারে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সিসিটিভি ফুটেজে দুর্ঘটনার আগে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার সংঘর্ষের দৃশ্য রয়েছে। সেই ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে প্রকৃত ঘটনা বের করা সম্ভব। তাই তদন্তে এসব তথ্যের যথাযথ মূল্যায়ন জরুরি। শুধু মামলার আসামি হওয়ার কারণে নয়, প্রত্যেকের ভূমিকা ও দায়ের ভিত্তিতেই আইনি সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।
তারা বলছেন, রিজন একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। তাঁর সামনে পড়াশোনা শেষ করে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। কিন্তু একটি দুর্ঘটনার পর তিনি এখন কারাগারে। যে তরুণের বাড়ি ফেরার কথা ছিল, তাঁর দিন কাটছে বন্দিজীবনে। দুর্ঘটনায় তাঁর ভূমিকা কী ছিল, তা নির্ধারণে সিসিটিভি ফুটেজসহ সব প্রমাণ গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. গাজিউর রহমান বলেছেন, ‘দুর্ঘটনায় প্রাইভেট কার চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সেই মামলায় সে কারাগারে রয়েছে। দুর্ঘটনার বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

